সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ নিয়ে আবারও আলোচনা, আন্দোলনের ঘোষণা নাগরিক সমাজের
চার বছর আগে নাগরিক সমাজের আন্দোলনের মুখে স্থগিত হওয়া চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহ্যবাহী সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ উদ্যোগটি আবারও আলোচনায় এসেছে। রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে যাবেন।
এদিকে কালচারাল হেরিটেজ ঘোষিত স্থানে আবারও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর একান্ত সচিব হাবিবুল হাসান রুমি স্বাক্ষরিত মন্ত্রীর সফরসূচিতে ১৮ এপ্রিল থেকে চারদিনের চট্টগ্রাম অঞ্চল সফরে বিস্তারিত বর্ণনা করা আছে। সেই অনুযায়ী আগামী ১৯ এপ্রিল বিকেল ৪টায় তার সিআরবি সংলগ্ন গোয়ালপাড়া এলাকায় প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শনের কথা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) মো. মনিরুজ্জামান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "পিপিপি মডেলে একটি হাসপাতাল নির্মাণের কথা ছিল। সেটি স্থগিত আছে। এই হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থান পরির্দশনের আসবেন মন্ত্রী মহোদয়। এটুকুই জানি।"
রেলওয়ের তথ্যমতে, এর আগে ২০২১ সালে সিআরবি এলাকার ছয় একর জমিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের নিজস্ব বিনিয়োগে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণের চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ৫০ বছর পর পুরো স্থাপনাটি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করার কথা, যা তখন রেলওয়ে হাসপাতাল হিসেবে গণ্য হবে।
এরপর নগরীর ফুসফুস খ্যাত বিশাল উন্মুক্ত স্থানে হাসপাতাল নির্মাণের মতো বিশাল বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন চট্টগ্রামের পরিবেশ কর্মী, সংস্কৃতি কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তবে সিআরবির পরিবর্তে চট্টগ্রামের অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে প্রকল্পটি স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন আবেদন করেছিল। দীর্ঘ আন্দোলন এবং সর্বশেষ তৎকালীণ চট্টগ্রামের মন্ত্রীদের হস্তক্ষেপে রেলপথ মন্ত্রণালয় চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে সিআরবিতে প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ না করার পক্ষে মত দিয়েছিল রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
কালচারাল হেরিটেজে বাণিজ্যিক স্থাপনা অবৈধ, হুমকিতে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ
২০০৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) সিআরবি এলাকাকে কালচারাল হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআরবির কোনো অংশ ব্যবহার করা যাবে না এবং এখানে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পাখির অভয়ারণ্য, জাদুঘর, প্রজাপ্রতি উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ফলে সিআরবিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল সে সময়।
নগরীর এই ঘন সবুজ এলাকায় ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া যায় ২০২১ সালের পরিচালিত এক গবেষণায়।
গবেষণায় সিআরবি এলাকায় মোট ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ৩৪ প্রজাতির। লতাজাতীয় উদ্ভিদ ২২ প্রজাতির। বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ৯টি। ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারে- এ রকম উদ্ভিদ ৬৬টি। এলাকাটিতে বড় গাছ রয়েছে ৮৮টি, যার মধ্যে রয়েছে শতবর্ষী গর্জন ও শিরীষ।
গবেষণার তথ্যমতে, সিআরবির বন-জঙ্গলে ১৮৩টি ঔষধি গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো ক্যানসার, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, জন্ডিস, অর্শসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিআরবি এলাকাটি নিজেই যেন একটি 'প্রাকৃতিক হাসপাতাল'। এখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে এসব ঔষধি গাছের বেশির ভাগ ধ্বংস হবে।
এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুর রউফসহ ১১ জনের সমাধি রয়েছে এই সিআরবিতে।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া টিবিএসকে বলেন, "বহু আন্দোলন করে সিআরবিতে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের সবাই জানে। এতো মানুষের জীবনের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ পাওয়ার পর সেই আগের পথে কেন হাটতে হবে? শুধু মানুষ মারলেই গণহত্যা নয়; সভ্যতা, ঐতিহ্য ধ্বংস করাও এক ধরনের গণহত্যা। এটি সভ্যতা ও ঐতিহ্য ধ্বংস করার উদ্যোগ।"
এদিকে সবুজ এলাকাটিতে আবারও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি সামনে আসায় আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ লক্ষ্যে শুক্রবার রাতে বৈঠক আহ্বান করেছে সিআরবি ইস্যুতে এর আগে আন্দোলন করা সংগঠন নাগরিক সমাজ। সংগঠনটি আগামী রোববার অর্থাৎ রেলমন্ত্রীর পরিদর্শনের দিন সকালে সিআরবিতে প্রতিবাদ সভা কর্মসূচি করবে।
সংগঠনটির উদ্যোক্তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "সিআরবি ঐতিহ্যগতভাবে যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বৃক্ষরাজিতেও অনন্য। পাহাড়তলী রেলের জমিতে নির্মিত হাজী ক্যাম্প এলাকায় হাসপাতাল করা যেতে পারে। সেখানকার মানুষও স্বাগত জানাত।''
তিনি আরও বলেন, ''আমরা রোববার সকালে প্রতিবাদ সভা করব।"
