পাহাড় থেকে পড়ে নয়, পাথরের আঘাতে মৃত্যু হয় সেই হাতি শাবকের
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের রামু সীমান্ত এলাকায় মৃত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া তিন মাস বয়সী হাতি শাবকটি পাহাড় থেকে পড়ে মারা যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, মানুষের ছোঁড়া পাথরের আঘাতেই প্রাণ হারিয়েছে শাবকটি।
গত ৩১ মার্চ শাবকটি মারা যায় এবং ২ এপ্রিল সেটি উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত করা হয়। গতকাল রোববার (৫ এপ্রিল) ময়নাতদন্তের এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি অবৈধ মাছের ঘেরের ভেতরে পাওয়া ওই শাবকের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। এসব আঘাতের মধ্যে মাথায় গুরুতর চোটের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ।
কক্সবাজারের দুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "পাথরের আঘাতই মৃত্যুর মূল কারণ। এছাড়া আঘাতজনিত ক্ষত থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে 'সেপটিসিমিয়া' তৈরি হওয়ায় মৃত্যু আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।"
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের রেঞ্জার অবিউজ জামান জানান, রাজারকুল বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলেই স্থানীয়রা ধান চাষ করেন। ধানক্ষেতে হাতির পাল ঢুকলে ফসল রক্ষায় স্থানীয়রা ইট-পাথর নিক্ষেপ করে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই সময় পাথরের আঘাতেই শাবকটি আহত হয়ে মারা যায়। পরে মা হাতিটি মৃত শাবকটিকে টেনে জলাধারে নিয়ে যায় এবং সেখানে টানা তিন দিন অবস্থান করে।
বনকর্মীরা জানিয়েছেন, মা ও বাবা হাতিটি বারবার শাবকের মৃতদেহ স্পর্শ করছিল, যেন তাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল। হাতি দুটি সরে যাওয়ার পর শাবকের দেহে বড় আঘাতের চিহ্ন দৃশ্যমান হয়। বন বিভাগ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনাস্থলটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার সীমানায় হওয়ায় শুরুতে জুরিসডিকশন বা এলাকা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, বিষয়টি জানার পর তদন্ত পাঠিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ঘটনাস্থলটি রামু এলাকায়। এরপর রামু উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ মরদেহ উদ্ধার ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় একটি অবৈধ মাছের ঘের দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে। বন বিভাগ গত দুই অর্থবছরে সেখানে বনায়ন করলেও ঘেরটি এখনো উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মানুষ ও বন্য হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে স্থানীয়দের নিয়মিত সতর্ক করা এবং সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে রাঙামাটির বরকল এলাকায় কাপ্তাই হ্রদে একটি বিরল গোলাপি রঙের হাতি শাবক মারা গিয়েছিল। সে সময়ও মা হাতিটি দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা শাবকের মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে শোকাতুর অবস্থান নিয়েছিল।
