দেশে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা, ট্রাকভাড়া বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ
দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চলমান অস্থিরতার প্রভাবে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহনে। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, বেনাপোল, খুলনা এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এতে নিত্যপণ্য সরবরাহে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয় পর্যায়েই বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
বেনাপোল অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা পরিবহন খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই রুটের চালক আবুল কাসেম বলেন, "কয়েক দিনের ব্যবধানে ট্রাকভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের ব্যবসা পথে বসবে।"
খুলনা রুটেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় এর প্রভাব দ্রুত বাজারে পড়ছে।
তরমুজ ব্যবসায়ী আলতাপ হোসেন বলেন, "আগে ২০ টনের একটি ট্রাকের ভাড়া সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা ছিল। এখন ২৫ হাজার টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।" এর ফলে ক্রেতাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি কৃষিপণ্য পরিবহনের সময় জ্বালানি সংকট ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বগুড়ার খন্দকার হিমাগারের মালিক মুহাম্মাদ শাহাদত হোসেন সাজু বলেন, "এখন আলু পরিবহনের ভরপুর মৌসুম। কিন্তু গাড়ি নিয়মিত বের করা যাচ্ছে না। আবার বের করলেও তেলের সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে।"
পোলট্রি খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতিও জটিল হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় মুরগি সরবরাহকারী ট্রাকচালক ইস্রাফিল আলম বলেন, "রংপুর থেকে ঢাকায় মুরগি পরিবহনের জন্য গাড়িভাড়া আগে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা ছিল, এখন ২১ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।"
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ব্যবসায়ী সুমন আলী। তিনি বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে রুখিয়ায় মরিচ পরিবহন করেন। তিনি বলেন, "বগুড়া থেকে আগে এক গাড়ির ভাড়া ছিল ২৮ হাজার টাকা। বর্তমানে সেটি ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার টাকায় উঠেছে।"
পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
জ্বালানি সংকটে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের দামও বাড়ছে, যার চাপ পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চাপ সামনে নিত্যপণ্যের দামে আরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বেনাপোলের ট্রাকচালক আবদুস সোবহান বলেন, "এক গাড়ি চাল নিয়ে যাচ্ছি। আগের চেয়ে চার হাজার টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। মালিকের এই টাকা তুলতে গেলে পণ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়বেই।"
সোবহান আরও বলেন, "আসলে দেশে তেলের, বিশেষ করে ডিজেলের, তেমন সমস্যা নেই। পর্যাপ্ত তেল নিয়েই ট্রাকগুলো চলাচল করছে। তেল সংকটের অজুহাতে ট্রাকের ভাড়া বাড়িয়েছেন মালিকপক্ষ।"
অন্যদিকে, পরিবহন মালিকদের দাবি, সময়মতো জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় ভাড়ার ওপর প্রভাব পড়ছে।
বেনাপোল ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আজিম উদ্দিন গাজি বলেন, "দেশে পেট্রোল-অকটেনের কিছুটা সমস্যা রয়েছে। কিন্তু ডিজেলের তেমন সমস্যা নেই। তারপরও নির্দিষ্ট সময়ে তেল না পাওয়ার প্রভাব ভাড়ায় পড়তে শুরু করেছে। পাম্পে চাহিদার অর্ধেক তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।"
ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও মজুদদারির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
যশোর চেম্বারের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপু বলেন, "বাজারে তেলের কোনো সংকট নেই। কিছু অসাধু মানুষ তেল মজুদ করছে। যে কারণে পাম্পগুলো গ্রাহক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ট্রাকভাড়া বাড়িয়েছেন মালিকরা।"
চট্টগ্রামে এখনো চলছে রেশনিং
ডিপো থেকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ এলেও চট্টগ্রামের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন এখনো বন্ধ রয়েছে বা রেশনিং করে জ্বালানি বিক্রি করছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং প্রত্যাহার করা হলেও বাস্তবে তা এখনো চলছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, নিয়মিত জ্বালানি পৌঁছাচ্ছে। তবে পাম্প মালিকদের দাবি, সরবরাহের পরিমাণ পর্যাপ্ত নয় এবং অনিয়মিত ডেলিভারির কারণে ধারাবাহিক সরবরাহ বজায় রাখা যাচ্ছে না।
রোববার নগরের কিউসি পাম্পে ১৩ হাজার লিটার অকটেন ও ৯ হাজার লিটার ডিজেল পৌঁছায়। তবে বাড়তি চাহিদার কারণে মজুদের ওপর চাপ তৈরি হয়। সিএমপি ফিলিং স্টেশনে বিকেলে ২ হাজার ৩৬৩ লিটার ডিজেল এবং ২ হাজার ৫৭৪ লিটার অকটেন ছিল, সেখানেও বিক্রি চলছিল।
সিএমপিতে সরকারি যানবাহনকে পূর্ণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকা এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ২ হাজার টাকার সীমা নির্ধারণ করা হয়। কিউসি ফিলিং স্টেশনেও একই ধরনের রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, অ্যাপোলো ফিলিং স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং ওয়াসা মোড়ের পাম্পগুলো সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
এক পাম্প মালিক বলেন, "ডিপো থেকে যা আসে, আমরা ঠিক সেটুকুই বিক্রি করি। গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, তাই রেশনিং করতে হচ্ছে।"
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন টিবিএসকে বলেন, "আমাদের স্টেশনগুলোতে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। ডিলাররা যতটুকু সরবরাহ দিচ্ছেন, আমরা ততটুকুই বিক্রি করছি।"
তিনি বলেন, "স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে ট্যাগ অফিসার নিয়োজিত আছেন। মূল সমস্যা হলো মজুত করা—অনেকে বাসায় অতিরিক্ত জ্বালানি সংরক্ষণ করছেন। জনসচেতনতা বাড়লে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।"
