হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে আবারও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ইরানের
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কেমন প্রভাব পড়ছে—তা বোঝার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন কয়টি জাহাজ পার হচ্ছে, সেটি।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রায় আট সপ্তাহ পর গত মঙ্গলবার এই জলপথ দিয়ে মাত্র একটি জাহাজ পার হয়েছে। এরপর বুধবার যখন আরও কিছু জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করে, তখন ইরান সেখানে দুটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালায়।
বিদেশি সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, 'তারা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, জাহাজে হামলা চালানোর হুমকি তারা শুধু মুখে দেয়নি, বরং তারা তা সত্যিই করছে। আর এই ভয়ই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার জন্য যথেষ্ট।'
তবে জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো ঠিকই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে।
এই সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রমাণ করে, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এখনও অটুট। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে, তবুও ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এই রণকৌশল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শান্তি আলোচনায় ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থানে (লেভারেজ) রাখবে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। কিন্তু এখন সরবরাহ ব্যবস্থা থমকে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে পেট্রোল, ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছে। এর ফলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চেপেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদিও বলছে যে তাদের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং দেশটির নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করা, তবে তেহরান এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের এক বড় যুদ্ধে রূপান্তর করেছে।
কয়েক দশক ধরে স্থলপথের পাইপলাইনের চেয়ে তিনটি ফুটবল মাঠের সমান দৈর্ঘ্যের বিশাল ট্যাংকারে তেল পরিবহন করা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ছিল। যদিও বর্তমানে কিছু পাইপলাইনের মাধ্যমে আগের চেয়ে বেশি তেল পরিবহন করা হচ্ছে, তবে সমুদ্রপথ বন্ধ থাকায় তৈরি হওয়া বিশাল ঘাটতি তার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি পার হতো, সাম্প্রতিক হামলার আগে সেই সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে মাত্র আটটিতে নেমে আসে। এরপর গত শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ঘোষণা দেয় যে এই জলপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত, তখন অনেক জাহাজই প্রণালিটি পার হওয়ার উদ্দেশ্যে সেদিকে যাত্রা শুরু করে।
কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইরান জানায়, তারা এই প্রণালিতে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করবে। কারণ ওমান উপসাগরে (হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ-পূর্বে) ইরানি জাহাজের ওপর দেওয়া মার্কিন নৌ-অবরোধ তখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।
সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল বিশ্লেষক সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড-এর বিশেষজ্ঞ মিশেল ভিসা বকম্যান লক্ষ্য করেন, প্রণালিটি উন্মুক্ত থাকার ওই কয়েক ঘণ্টায় অনেক জাহাজই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু গত শনিবার ইরান একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে—এমন খবর আসার পর ট্র্যাকিং সফটওয়্যারে দেখা যায়, অন্তত ৩৩টি জাহাজ তাদের পার হওয়ার চেষ্টা বন্ধ করে দেয়।
বকম্যান বলেন, 'শনিবার সকালে এক ধরনের প্রাথমিক আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এরপর আক্ষরিক অর্থেই আমার চোখের সামনে সবকিছু পাল্টে যেতে দেখলাম।'
তিনি আরও জানান, ইরানের সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান সম্পর্ক নেই—এমন মাত্র ১২টি জাহাজ শেষ পর্যন্ত এই পথ দিয়ে পার হতে পেরেছে।
যেসব জাহাজ ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, তাদেরও এখন এই পথ দিয়ে যাতায়াতের জন্য তেহরানের অনুমতি নিতে হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে জাহাজগুলোকে মাঝখানের প্রধান দুটি পথ ছেড়ে তাদের উপকূলের গা ঘেঁষে চলতে হবে। এর ফলে এই আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক নিয়ম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
বকম্যান বলেন, 'বর্তমানে এই পথে নৌ-চলাচলের কোনো স্বাধীনতা নেই।'
এদিকে, গত বুধবার আক্রান্ত হওয়া দুটি পণ্যবাহী জাহাজের নাম প্রকাশ করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যম। এগুলো হলো—'এমএসসি ফ্রান্সেসকা' ও 'এপামিননডাস'। এমএসসি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি।
অন্যদিকে, এপামিননডাসের গ্রিক ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান 'টেকনোমার শিপিং' এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, একটি সশস্ত্র গানবোট থেকে তাদের জাহাজে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। তবে জাহাজের কর্মীরা সবাই নিরাপদ আছেন।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে গত রোববার পর্যন্ত ৩০৮টি ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে, যার গড় হার প্রতিদিন ছয়টি। এসব জাহাজ হয় ইরানি পণ্য বহন করছিল অথবা অবরোধ এড়াতে তাদের অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রেখেছিল। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নেই—এমন মাত্র ৯০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যেতে পেরেছে।
ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেশটির অর্থনীতিতে আঘাত হানতে গত ১৩ এপ্রিল থেকে কঠোর নৌ-অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো ইরানি জাহাজ এই অবরোধ ভেদ করতে পারেনি। তারা ২৯টি জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার এবং গত রোববার একটি ট্যাংকার জব্দ করার কথা জানিয়েছে।
তবে লয়েডস লিস্টের বিশ্লেষকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, ১৩ এপ্রিলের পর অন্তত সাতটি ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এই বিশ্লেষণকে চ্যালেঞ্জ করে জানিয়েছেন, ইরানি কোনো জাহাজ অবরোধ এড়াতে সক্ষম হয়নি।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর বড় কোনো যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নেই। তবে সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, তারা সেখানে 'এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি' আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছেন এবং এটি একটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নৌবাহিনী নিজে যেখানে সরাসরি প্রণালিতে কাজ করছে না, সেখানে অন্য জাহাজগুলো নিরাপদ বোধ করছে না। জার্মান শিপিং জায়ান্ট হ্যাপাগ-লয়েডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অ্যান্ডার্স বোয়েনাস বলেন, 'কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই হামলা হওয়ায় পরিস্থিতি এখন চরম অনিশ্চিত ও অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।'
