মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত, বাড়তি খরচে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি বেড়েছে
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) জন্য বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীদের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকেছে। এ কারণে এলপিজির সরবরাহে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মতো সংকট নেই। ফলে মার্চ মাসে দেশের মাসিক চাহিদার চেয়েও বেশি এলপিজি আমদানি করা গেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, দেশে এলপিজির মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে মার্চে আমদানির পরিমাণ ১ লাখ ৮৩ হাজার টনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে এবং প্রায় ২০ শতাংশ আনা হয়েছে ওমান থেকে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই এলপিজি আনতে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এই অঞ্চলের রপ্তানির একটি বড় অংশ স্থবির হয়ে পড়েছে। এর আগে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে এলপিজি বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশই আসত এই অঞ্চল থেকে।
সরবরাহে এই বিঘ্নের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এপ্রিলের জন্য খুচরা পর্যায়ে এলপিজির দাম কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়েছে বিইআরসি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হওয়া নতুন এই দামের ফলে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান টিবিএসকে বলেন, সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিল মাসের জন্য খুচরা পর্যায়ে দাম অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তিনি পণ্য পরিবহনের ভাড়া নিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলবেন।
সৌদি আরামকো এপ্রিল মাসের জন্য প্রোপেনের অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট প্রাইস প্রতি টনে ২০৫ ডলার বাড়িয়ে ৭৫০ ডলার করেছে। অন্যদিকে বিউটেনের দাম ২৬০ ডলার বাড়িয়ে ৮০০ ডলার নির্ধারণ করেছে। প্রোপেন ও বিউটেন মিশিয়েই এলপিজি তৈরি করা হয়। সৌদি আরামকো প্রতি মাসে এই কন্ট্রাক্ট প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়। এর সাথে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত প্রিমিয়ামের মধ্যে থাকে পরিবহন খরচ, সরবরাহকারীর মুনাফা ও বাড়তি ঝুঁকির মূল্য।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল মার্কিন সরবরাহ রুট ব্যবহারের কারণে আমদানি ব্যয় অনেকটা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এলপিজি কার্গোর জন্য এখন প্রতি টনে কন্ট্রাক্ট প্রাইসের সঙ্গে বাড়তি প্রায় ২০০ ডলার গুনতে হচ্ছে। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ইরাক, বাহরাইন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে সরবরাহের ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট প্রাইসের সঙ্গে ১০০ থেকে ১২০ ডলার বেশি দিতে হতো।
এলপিজির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে আসার এই প্রভাব বাংলাদেশের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য আসতে যেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগত, সেখানে মার্কিন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বঙ্গোপসাগরে চালান পৌঁছাতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে। এতে পণ্য পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন পিএলসি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশ-এর (লোয়াব) সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজার ঘোষণা করার পর অনেক কোম্পানির ঋণপত্র (এলসি) বাতিল হয়ে যায়। ফলে তারা এলপিজি আমদানি করতে পারেনি।'
তিনি জানান, ওমেরা, যমুনা, আইগ্যাজ, পেট্রোম্যাক্স, ডেল্টা ও বিএম-এর মতো কোম্পানিগুলো বেশি খরচ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বাংলাদেশ আগে প্রায় পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখন মোট আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই আসত ইরাকের বসরা থেকে।
তিনি বলেন, 'যুদ্ধের কারণে ওই উৎসগুলো এখন আর নেই বললেই চলে। স্পট মার্কেট এখন অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের সঙ্গে যাদের মেয়াদি চুক্তি আছে, কেবল তারাই এখন আমদানি করতে পারছে।'
এই সংকট সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। জানুয়ারিতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন ও ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৭০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে।
বর্তমান সরবরাহের একটি অংশ আসছে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে। থাইল্যান্ডের শ্যাম গ্যাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে কার্গো সংগ্রহ করে ভারতের ধামরা বন্দরে পাঠাচ্ছে, সেখান থেকে তা বাংলাদেশে সরবরাহ করছে। কোম্পানিটি ইউরোপীয় রুটও ব্যবহার করছে; তারা আজারবাইজান থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে আমস্টারডাম বন্দরের মাধ্যমে তা পুনরায় পরিবেশন করছে।
দেশের বৃহত্তম অপারেটর ওমেরা এলপিজি-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিম চৌধুরী বলেন, মার্চে এলপিজির সিংহভাগই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যেহেতু একাধিক উৎস থেকে এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব, তাই এর কোনো ঘাটতি হবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে তার দুশ্চিন্তা চাহিদার কমে যাওয়া নিয়ে। তানজিম টিবিএস-কে বলেন, 'দাম অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে এলপিজির চাহিদা কমে যাবে।'
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো সংকটে দেশ চরম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। দেশে ২৯টি এলপিজি অপারেটর থাকলেও বর্তমানে মাত্র আধাডজন প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
