রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তায় কাটছাঁট: ক্যাম্পে অসন্তোষ, মানবিক সংকটের শঙ্কা
কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। ১ এপ্রিল থেকে 'নিড-বেসড' বা প্রয়োজনভিত্তিক নতুন পদ্ধতিতে তিনটি ক্যাটাগরিতে এই সহায়তা প্রদান শুরু হয়েছে। তবে সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী, এতদিন সব রোহিঙ্গা পরিবার মাথাপিছু ১২ ডলার করে পেলেও এখন থেকে পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলার হারে মাসিক খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ডব্লিউএফপি-র তথ্যমতে, সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ পাচ্ছেন ৭ ডলার, ৩৩ শতাংশ পাচ্ছেন ১২ ডলার (বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩ ডলারসহ) এবং বাকি ৫০ শতাংশ পাচ্ছেন ১০ ডলার করে। এই পরিবর্তনের পেছনে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অভাবকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যেখানে বছরে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল থাকত, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০০ মিলিয়নে। চলতি বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন থাকলেও কত অর্থায়ন পাওয়া যাবে তা এখনো অনিশ্চিত।
তিনি বলেন, "২০১৭ সালে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তখন মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখে। পরবর্তীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নেওয়ায় এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এছাড়া ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ হলেও অনিবন্ধিত আরও অনেক রোহিঙ্গা রয়েছে।"
মিজানুর রহমান আরও জানান, ২০১৭ সালের পর দাতা গোষ্ঠীগুলোর সহায়তায় বড় পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম চললেও গত কয়েক বছরে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, পুষ্টিহীনতা বাড়বে এবং অনেকেই জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে যেতে বা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে ক্যাম্পগুলোতে চুরি-ডাকাতিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।"
নতুন এই পদ্ধতি চালুর পর থেকেই ক্যাম্পগুলোতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা লাল মতি (৪৫) বলেন, "১২ সদস্যের পরিবার নিয়ে ৭ ডলারের খাদ্য সহায়তায় চলা অসম্ভব। পরিবারের কেউ আয় করতে না পারায় আমরা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছি।"
ক্যাম্প-৩-এর বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুর (৬০) বলেন, "সহায়তা কমানোর কারণ জানতে চাইলে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ করার কথা বলা হলেও তার সঠিক কোনো দিকনির্দেশনা নেই।"
খাদ্য সহায়তার ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য দেওয়া হলেও এখন তা অনেকটাই সীমিত। ক্যাম্পের বাসিন্দা রায়জু (২০) বলেন, "আগে যেখানে পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী পাওয়া যেত, এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই সামান্য খাদ্য দিয়ে কীভাবে পুরো মাস চলবে?" ছেনুয়ারা বেগম (২২) নামে আরেকজন বলেন, অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য এখন বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, যা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
সহায়তা কমে যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ ইদ্রিস (২৪) ও নুরুল ইসলাম (৪৫) আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, পেটের দায়ে অনেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
রোহিঙ্গা নেতারাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সহায়তা প্রদান রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যমূলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি অপরাধ প্রবণতা বাড়াবে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব পরিবারে কর্মক্ষম সদস্য রয়েছে বা কোনো আয়ের উৎস আছে, তাদের তুলনামূলক কম সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।
আরআরআরসি মো. মিজানুর রহমান পরিশেষে বলেন, "এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। তবে প্রায় এক দশকেও এ প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।"
