এডিপি বাস্তবায়নের হার কিছুটা বাড়লেও টাকার অঙ্কে ব্যয় কমেছে
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সার্বিক বাস্তবায়ন হার কিছুটা বাড়লেও টাকার অঙ্কে ব্যয়ের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কমেছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এডিপির অর্থ ব্যয় হয়েছে মোট ৬৩ হাজার ৩২৭.৫৩ কোটি টাকা—যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ হাজার ২২৫.৬৮ কোটি টাকা কম। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির মোট আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫.৫৩ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এডিপি বরাদ্দ থেকে মোট ৬৭ হাজার ৫৫৩.২১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
আইএমইডি কর্মকর্তারা জানান, এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এডিপির বরাদ্দের ৮৫ হাজার ৬০২.৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। সেই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরে এডিপি ব্যয় কমেছে প্রায় ২২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা।
ব্যয়ের পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবায়নের হার কিছুটা বেড়েছে।
আইএমইডির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৩০.৩১ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৯.৮৭ শতাংশ।
আইএমইডির কর্মকর্তারা বলেন, গত অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল না।
তারা বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনে অস্থিরতা ছিল, অনেক প্রকল্পের পরিচালক ও ঠিকাদার চলে যায়। এ কারণে গত অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছিল।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল আরও বেশি; তখন প্রথম আট মাসে বরাদ্দের ৩৩.৬৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছিল।
প্রকল্পের কাজ ব্যাহত ও পর্যালোচনা
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানায়, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তেনের ফলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অনেক প্রকল্প পরিচালককে পাওয়া যায়নি, কেউ কেউ দুর্নীতির অভিযোগে সরে গেছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময় নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগেও সময় লেগেছে।
পাশাপাশি বহু প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে, যা পুনরায় কার্যক্রম শুরুতে বিলম্ব ঘটিয়েছে। সম্প্রতি অনুমোদিত সরকারি ক্রয়নীতির কারণে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দরপত্র প্রক্রিয়ায় যেতে সময় নিয়েছে।
এসব কারণে এডিপির বরাদ্দ লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে চলমান প্রকল্পগুলো নতুন করে পর্যালোচনার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রকল্পগুলো সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা যাছাই-বাছাই শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসের মধ্যেই চলমান প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প যাছাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হবে।
এ প্রক্রিয়ার কারণে চলমান অনেক প্রকল্পে বরাদ্দ আটকে যেতে পারে। এতে অর্থবছরের বাকি সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের গতি আরও ধীর হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।
তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও অগ্রাধিকার নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করবে—এটি স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, 'এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পগুলো আগের সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী নেওয়া হয়েছিল। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের নিজস্ব উন্নয়ন দর্শন ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় এডিপির প্রকল্পসমূহ পর্যালোচনা করা স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।'
মুজেরী বলেন, এই পর্যালোচনার মাধ্যমে যেসব প্রকল্প বর্তমান পরিস্থিতি বা নতুন সরকারের নীতিগত লক্ষ্যসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো বাতিল বা সংশোধন করা হতে পারে। 'একইসঙ্গে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক নতুন প্রকল্প, যেমন খাল পুনঃখনন বা পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কর্মসূচি এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছু সময় প্রয়োজন হবে। অর্থবছরের অবশিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা কম।
মুজেরী বলেন, 'কেবল বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে ব্যয় বাড়ানো যৌক্তিক হবে না। বরং নতুন সরকার যদি সময় নিয়ে এডিপির প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় বা কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাদ দেয় এবং প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সাময়িকভাবে বাস্তবায়নের হার কম থাকলেও তা দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।'
অর্থায়নের উৎস অনুযায়ী ব্যয়
আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৩৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬.৭৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ২৫.৮২ শতাংশ।
জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে ব্যয়ের হয়েছে ২৪ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ৩৪.৬০ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা বা ৩৩.৯২ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকায়, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
