লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে নিহত ১৮ বাংলাদেশির ১০ জনই সুনামগঞ্জের
লিবিয়া থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার পথে গ্রিসের উপকূলে নৌকাডুবিতে অন্তত ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় প্রাণ হারানো বাংলাদেশিদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। এছাড়া জেলার আরও এক যুবক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে নিহতের পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে জানা গেছে, নিহতদের অনেকের মরদেহ পচে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় মাঝ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জের নিহত ও নিখোঁজ যারা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১০ জনের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলারই রয়েছেন পাঁচজন। তারা হলেন: উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের আকলিফ মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০), পৌর এলাকার কবিরপুর গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২২), ইছগাঁও গ্রামের বাছির হোসেনের ছেলে আলী হোসেন (২৫) এবং বাউরি গ্রামের সামসুল হকের ছেলে ইবাদত হক সুহানুর (২২)।
দিরাই উপজেলার নিহত চারজন হলেন: তারাপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩০), একই গ্রামের মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান (২৫), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৮) এবং রনারচর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০)।
এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফাহিম আহমেদ মুন্না (২০) এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের তারেক (২২) নামের আরও এক যুবক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বেঁচে ফেরা যুবকের বয়ান
নৌকাটি থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি। ভিডিওতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া কিশোরগঞ্জের এক যুবক জানান, 'আমাদেরকে বড় বোটের কথা বলে ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। ওই নৌকায় ৫ জন সুদানি এবং ৩৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন। ১৮ জন মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশের বাড়ি সুনামগঞ্জ ও সিলেটে। মারা যাওয়া যুবকদের মরদেহ দুই দিন নৌকায় রাখা হয়েছিল। পরে মরদেহ পচে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় সবাইকে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। লবণের পানিতে আমাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।'
দালালচক্রের খপ্পরে সর্বস্বান্ত পরিবার
নিহতদের স্বজনরা জানান, উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা দিয়ে এই মরণযাত্রায় সামিল হয়েছিলেন তারা। দিরাইয়ের নিহত নুরুজ্জামান ময়নার মামা উমেদ আলী জানান, তারাপাশা গ্রামের মুজিবুর রহমান নামের এক দালালের সাথে ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন ময়নাসহ চারজন। নিরাপদ নৌকার কথা বলে তাদের ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।
জগন্নাথপুরের নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের মাধ্যমে তারা গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বিল্লাল গ্রিসে বসে 'দালালি নেটওয়ার্ক' নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তার ভাই দুলাল দেশ থেকে লোক সংগ্রহ করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।
নিহত আমিনুর রহমানের শ্যালক জাহিদুর রহমান জানান, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি আমিনুর রওনা হন। ১১ লাখ টাকা চুক্তিতে ৩ দিনে গ্রিস পৌঁছানোর কথা থাকলেও তাকে ৩ মাস লিবিয়ার 'গেমঘরে' আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন ও অনাহারে রাখা হয়েছিল। আমিনুর বাড়িতে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের এক কন্যা সন্তান রেখে গেছেন। অন্য দিকে শায়ক মিয়া মাত্র তিন মাস আগে ঘর ছেড়েছিলেন।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার বলেন, 'গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে দিরাইয়ের চারজন মারা যাওয়ার বিষয়টি আমরা স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়েছি। এর মধ্যে তিনজন কুলঞ্জি ইউনিয়নের এবং একজন রাজানগর ইউনিয়নের। তাদের সাথে থাকা আরও দুজনের মাধ্যমে এই তথ্য পাওয়া গেছে।'
জগন্নাথপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, 'ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে জগন্নাথপুরের চারজন নিহতের খবর আমরা পেয়েছি। তবে প্রকৃত সংখ্যা কত তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।'
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সুনামগঞ্জজুড়ে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে। সচেতন নাগরিক সমাজ এই অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের সাথে জড়িত দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
