এলডিসি উত্তরণ আরও ৩ বছর পেছাতে চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ সরকার স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী একগুচ্ছ বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে এই আবেদন জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশের এই আপিল ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য আগামী ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, এ বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটার কথা রয়েছে।
প্রস্তুতিমূলক সময় ঠিকমতো কাজে লাগেনি
চিঠিতে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন অগ্রগতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য এবং কোভিড-১৯ মহামারীর অভূতপূর্ব প্রভাবের পর একটি সহজ উত্তরণ নিশ্চিত করতে আগে দেওয়া পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময়ের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
সিডিপি প্রথমবার যখন বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ করেছিল, তখন থেকেই সরকার এই প্রক্রিয়াটি সহজ, টেকসই এবং অপরিবর্তনীয় করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে আসছে।
সেই লক্ষ্যে, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাংলাদেশ তার 'স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি' (এসটিএস) প্রণয়ন করেছে। সরকার প্রধানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ-পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি এর বাস্তবায়ন তদারকি করছে।
উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা উন্নত করার জন্য সংস্কার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, 'যদিও দেশটি মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক—এই তিনটি মানদণ্ডই সফলভাবে পূরণ করে চলেছে, কিন্তু একের পর এক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কার কারণে প্রস্তুতিমূলক সময়টি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।'
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ চাপ
চিঠিতে উল্লিখিত বৈশ্বিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও ধীরগতির বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্ব জ্বালানি ও খাদ্য বাজারে এর প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ; কঠোর বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধীরগতি।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান যার ফলে সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) আশ্রয় দেওয়ার অব্যাহত বোঝা সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই সমন্বিত ধাক্কাগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং কর-জিডিপি অনুপাত দুর্বল হওয়ার দিকে নিয়ে গেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার সুশাসন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা দারিদ্র্য বিমোচনের ধারাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, 'ফলস্বরূপ, নীতির মূল মনোযোগ বাধ্য হয়ে স্বল্পমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে গেছে।'
এতে আরও বলা হয়েছে, এসটিএস-এর অধীনে বেশ কিছু অগ্রাধিকারমূলক কাজ পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
আরও বলা হয়, 'উত্তরণের জন্য সুশৃঙ্খল প্রস্তুতির সুযোগ দিতে যে পাঁচ বছরের সময় দেওয়া হয়েছিল, তা মূলত সংকট ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টিকে থাকার লড়াইয়েই কেটে গেছে। ফলে প্রস্তুতিমূলক সময়টি যেভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি।'
বাণিজ্য ঝুঁকি ও সুবিধা হারানোর আশঙ্কা
সরকার এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেছে।
উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ইইউ-এর জিএসপি প্লাস সুবিধার জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য অযোগ্যতা, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়মের অস্থিরতা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ নির্ভরশীলতা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে 'আগাম বাণিজ্য সুবিধা হারালে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও উন্নয়ন গতি ব্যাহত হতে পারে।'
সংকটকালীন বিধানের অধীনে অনুরোধ
এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকার সতর্ক করেছে যে, বিদ্যমান সময়সীমা অনুযায়ী উত্তরণ ঘটলে তা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি পারফরম্যান্স, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে।
সেই অনুযায়ী, বাংলাদেশ সিডিপি-কে অনুরোধ করেছে যেন 'এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম'-এর সংকটকালীন বিধানের অধীনে প্রস্তুতিমূলক সময়টি আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
কর্তৃপক্ষের মতে, এই বাড়তি সময় সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে, সংস্কার সুসংহত করতে এবং এসটিএস-এর অধীনে অগ্রাধিকারমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সুযোগ দেবে।
সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারির বৈঠকের দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। এরপর সিডিপি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সেপ্টেম্বর নাগাদ হতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
কর্মকর্তারা জানান, আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপগুলো চলমান মূল্যায়নের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান। তিনি বলেন, 'এই উদ্যোগের ফলে আমরা বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কিছু সময় পাব। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি বড় সুফল বয়ে আনবে।'
তিনি আরও বলেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মতো নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব চুক্তি রাতারাতি সম্ভব নয়; এগুলোর জন্য সময়, কারিগরি বিশ্লেষণ এবং ধাপে ধাপে দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন।
তাড়াহুড়ো করলে প্রতিকূল শর্তে চুক্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকে—বলে সতর্ক করেন তিনি।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'আমরা এখন ফেব্রুয়ারিতে আছি, আর উত্তরণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। নভেম্বরের আগে এটি সম্পন্ন করা সহজ নয়। তাই বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে সময় বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।'
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সময় বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়; বরং তথ্য-উপাত্ত ও সূচকের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ এখনও তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে প্রয়োজনীয় সীমার ওপরে রয়েছে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও এসব সূচকে মানদণ্ড পূরণ করেছে।
তিনি বলেন, সময় বাড়ানোর জন্য সাধারণত অন্তত দুটি সূচকে বড় ধরনের দুর্বলতা বা ঝুঁকি বৃদ্ধি দেখাতে হয়।
তাই শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ দেখিয়ে সময় বাড়ানো পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
