এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে নারী শ্রমশক্তি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের আগে দেশে নারীদের কর্মসংস্থানে উদ্বেগজনক পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, নারী শ্রমশক্তির সংখ্যা ২০২৩ সালের ২৫.৩ মিলিয়ন থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৩.৭ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশ প্রবৃদ্ধির গতি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইনোভিশন কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড, বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন) ও ভয়েস ফর রিফর্ম-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গতকাল (৫ জানুয়ারি) ঢাকায় অনুষ্ঠিত 'ফিমেইল এমপ্লয়মেন্ট অ্যাজ আ ন্যাশনাল অপরচুনিটি ফর অ্যাডভান্সিং ইকোনমিক রিফর্ম ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে নীতিনির্ধারক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, থিঙ্ক ট্যাংক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নারী সংগঠন, অধিকারকর্মী ও অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ড. কাইয়ুম আরা বেগম এই প্রবণতার পেছনের কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে বলেন, প্রথাগত খাতগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হচ্ছে না।
'কৃষি খাত তার নারী শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ হারিয়েছে, কারণ অনেকেই অনানুষ্ঠানিক পার্লারের মতো কাজে চলে গেছেন। এর ফলে কৃষি খাতে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানগুলো অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে,' বলেন তিনি।
সংলাপে উপস্থাপিত গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও নারীদের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। শহুরে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ২০২৩ সালের ২৫.১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ২২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মূল কারণ হিসেবে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া এবং অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে কারখানার সামগ্রিক কর্মসংস্থান ৩০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সেলাই ও ট্রিমিংয়ের কাজে যুক্ত নারীদের ওপর।
এদিকে, শিক্ষিত নারীরা দক্ষতা ও চাকরির মধ্যে তীব্র অসামঞ্জস্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। স্নাতক ডিগ্রিধারী নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার নারীদের জাতীয় গড় বেকারত্ব হারের প্রায় ছয়গুণ।
কর্মসংস্থানের গুণমান নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। কারণ কর্মরত নারীদের ৯৫.৯৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মজীবনে উন্নতির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, 'আনুষ্ঠানিক খাতের নিয়োগকর্তারা প্রায়ই নারীদের নিয়োগকে বাজে বিনিয়োগ মনে করেন। আমাদের এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কেবল বাধ্য হয়ে নয়, বরং প্রকৃত আগ্রহ থেকেই নারীদের নিয়োগ দিতে উৎসাহিত হন।'
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, নারীদের কর্মসংস্থান কেবল একটি সামাজিক বিষয় নয়, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ জোরদার না করলে দেশ 'মধ্যম আয়ের ফাঁদে' পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এ প্রসঙ্গে ভিয়েতনামের উদাহরণ টানা হয়, যেখানে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশেরও বেশি, যা দেশটির রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করেছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যখন অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা হারাবে, তখন উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি ও রাজস্ব আয় বাড়াতে নারী শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো অপরিহার্য বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।
অনুষ্ঠানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চরম বঞ্চনার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, প্রতিবন্ধী নারীদের মধ্যে কর্মসংস্থানের হার মাত্র ১২.৮ শতাংশ, যেখানে প্রতিবন্ধী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৭.৫৯ শতাংশ।
এই নিম্নমুখী প্রবণতা রোধে সংলাপে আগামী সরকারের জন্য একটি সংস্কারের রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়। এতে সাশ্রয়ী মূল্যের চাইল্ডকেয়ার সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়, কারণ বর্তমানে ৫৪ শতাংশ নারী অপর্যাপ্ত শিশুযত্ন ব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা মনে করেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
ডিভাইন বিউটি লাউঞ্জের স্বত্বাধিকারী নাবিলা খান বৈষম্যমূলক পারিবারিক দায়িত্বের বোঝার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, 'সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা পুরুষদের দিক থেকেও বদলানো উচিত, ঠিক যেমন নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।'
