উচ্চ ফলনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান ২০২৪ সালে জিংক ও আয়রনসমৃদ্ধ ব্রি ধান–৮৪ আবাদ করেছিলেন। কিন্তু চালের রং লাল হওয়ায় তিনি তা বাজারে বিক্রি করতে পারেননি। পরে বাধ্য হয়ে হাঁস-মুরগিকে খাওয়ানোর জন্য খুব কম দামে বিক্রি করতে হয়। এরপর থেকে তিনি আর এ ধরনের ধান আবাদ করেননি।
মূলত কম ফলন এবং বাজার না থাকায় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ বিভিন্ন ধানের জাত এখনো কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে নতুন ধানের জাত নির্বাচন করতে গিয়ে অধিকাংশ কৃষক এখনো পুষ্টিগুণ বা জলবায়ু সহনশীলতার চেয়ে উচ্চ ফলনকেই বেশি গুরুত্ব দেন। সম্প্রতি এক গবেষণায়ও এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইনস্টিটিউট (এডিবিআই) প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া কৃষকদের প্রায় ৮১ শতাংশ জানিয়েছেন—নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের সুযোগ পেলে তারা উচ্চ ফলনশীল জাতকেই অগ্রাধিকার দেবেন। বিপরীতে মাত্র ১৯ শতাংশ কৃষক পুষ্টিগুণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, লবণাক্ততা বা খরা সহনশীলতা, কিংবা পানি ও সার সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
গবেষণাটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ফরিদপুর জেলার চারটি উপজেলার ৩৯টি গ্রামে পরিচালিত হয়। এতে ৩ হাজার ৪৯৩টি কৃষক পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কৃষক মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "এবার আমি ৫০ বিঘা জমিতে জিরাশাইল ও আতপ ধান করেছি। গতবার ব্রি ধান–১০৫ করেছি, যা ডায়াবেটিক ধান হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার এই বীজ আমি পাইনি।"
তিনি আরও বলেন, "২০২৪ সালে যখন জিংক ধান করেছিলাম, তখন দোকানদার তা ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ মানুষ এর মূল্য বুঝেনি। অথচ পুষ্টিগুণ বাড়ানোর জন্য এসব জাত জরুরি। বাজার তৈরি না হওয়ায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হয়। তাই সরকারিভাবে এসব জাতকে প্রাধান্য দিলে কৃষকরাও চাষে আগ্রহী হবেন।"
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধান দেশের প্রধান খাদ্য। ২০২২ সালে মানুষের দৈনিক খাদ্যশক্তির প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং প্রোটিনের ৪৮ শতাংশই এসেছে ধান থেকে। একই বছরে দেশে মাথাপিছু ধান খাওয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪৭ কেজি, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ।
তবে ধানভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে দেশে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি বা 'হিডেন হাঙ্গার' বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৮ শতাংশ খর্বাকৃতি এবং ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রজননক্ষম বয়সী নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। এছাড়া প্রায় ৪১ থেকে ৫৭ শতাংশ নারী ও শিশু জিংকের ঘাটতিতে ভুগছেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো পুষ্টিগুণ বাড়ানো ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অন্তত ৯টি জিংকসমৃদ্ধ ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি ধান–১০০ উল্লেখযোগ্য, যাতে প্রতি কেজি ধানে প্রায় ২৫ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম জিংক রয়েছে।
এছাড়া ২০২৩–২০২৪ সালে ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ২ শতাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ নতুন কয়েকটি ধানের জাতও অবমুক্ত করা হয়েছে।
তবে এসব নতুন জাত থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা এখনো পুরোনো উচ্চ ফলনশীল জাতের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সালে উদ্ভাবিত ব্রি ধান–২৮ ও ব্রি ধান–২৯ এখনো দেশের সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ধানের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে জিংকসমৃদ্ধ ধানের চাষ দেশের মোট ধান আবাদি জমির মাত্র প্রায় ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ।
গবেষণার বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, কৃষকের শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থান ধানের জাত নির্বাচনে ভূমিকা রাখে। তুলনামূলকভাবে বেশি শিক্ষিত কৃষকেরা পুষ্টিগুণ বা জলবায়ু সহনশীল বৈশিষ্ট্যের প্রতি কিছুটা বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে বড় পরিবার, বেশি জমি বা যান্ত্রিক কৃষিযন্ত্রের মালিকানা থাকলে কৃষকেরা উচ্চ ফলনশীল জাত বেছে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখান।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের কৃষকেরা মূলত অর্থনৈতিক লাভ ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে ফলনকে অগ্রাধিকার দেন। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ বা জলবায়ু সহনশীল বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও নতুন অনেক ধানের জাত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের সময় উচ্চ ফলনের পাশাপাশি পুষ্টিগুণ ও জলবায়ু সহনশীল বৈশিষ্ট্য একত্রে যুক্ত করতে হবে। এতে কৃষকেরা সহজে এসব জাত গ্রহণ করবেন এবং একই সঙ্গে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা টিবিএসকে বলেন, "পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ধানের জাত সম্প্রসারণে কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই কৃষক আর্থিক দিকটি বিবেচনা করবেন। আমরা খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং নিরাপদ খাদ্য—এই তিন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করি।"
