বাড়তি কোচ সংযোজন ও মেরামত: ঈদযাত্রায় যাত্রীর চাপ সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে রেলওয়ে
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যাত্রীদের ভিড় সামলাতে ট্রেনের কোচসংখ্যা বাড়ানো, কয়েক ডজন পুরনো বগি মেরামতসহ ইতিমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদযাত্রায় ট্রেন এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং এর ফলে সড়ক পরিবহনে বাড়তি চাপের কারণে সড়কের বিপুলসংখ্যক যাত্রী ট্রেনের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এ কারণে এবার ট্রেনে যাত্রীদের ভিড় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেল কর্তৃপক্ষ প্রধান রুটগুলোতে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একইসঙ্গে যাত্রীদের স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে অধিক চাহিদাসম্পন্ন কিছু রুটে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা নতুন কোচ নামানোর প্রক্রিয়া চলছে। এসব আধুনিক কোচ ঈদযাত্রায় সেবার মান আরও বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলেওয়ে ওয়ার্কশপে ১২২টি কোচ মেরামতের কাজ পুরোদমে চলছে। এসব কোচের অনেকগুলোই আগে অব্যবহৃত ছিল অথবা মেরামতের প্রয়োজন ছিল।
পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক মোস্তফা জাকির হাসান টিবিএসকে বলেন, ১২২টি কোচ মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গত দুই মাস দিন-রাত কাজ চলছে।
তিনি বলেন, 'কোচগুলোকে অনেকটা নতুন রূপ দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে ৫০ শতাংশ চলমান কোচ, যেগুলো মেরামতের প্রয়োজন। বাকি ৫০ শতাংশ ওয়ার্কশপে পড়ে থাকা অচল কোচ।'
এ পর্যন্ত ৯৪টি কোচ মেরামত সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোও ঈদযাত্রা শুরুর আগেই সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
রেলওয়ে সূত্রমতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সর্বোচ্চ পরিমাণ বাড়তি কোচ সংযোজন করা হবে। এর মধ্যে বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে কোচের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হবে। এছাড়াও একই রুটের তূর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর গোধূলি এক্সপ্রেস ও মহানগর এক্সপ্রেসেও বাড়তি কোচ যোগ করা হবে।
চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের বিজয় এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটের মেঘনা এক্সপ্রেস এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের পর্যটক ও কক্সবাজার এক্সপ্রেসেও ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কোচ সংযোজন করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রতিটি ট্রেনে দুই থেকে তিনটি কোচ সংযোজন করা হবে ঈদ উপলক্ষে। ১৬ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঈদযাত্রা ও বাড়ি ফেরার ট্রেনগুলো চলবে।
বাড়তি কোচ সংযোজনের পাশাপাশি রেল কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি রুটে ট্রেনের সেটগুলোও নতুন করে সাজাচ্ছে এবার। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া নতুন মিটারগেজ কোচ দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের তূর্ণা-নিশীথা এক্সপ্রেসের একটি নতুন রেক (ইঞ্জিনবিহীন পূর্ণাঙ্গ বগির সেট) সাজানো হচ্ছে।
তূর্ণা এক্সপ্রেসের বর্তমান সেটটি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে একই রুটের মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনে। আর মহানগর এক্সপ্রেস থেকে সরিয়ে নেওয়া সেটটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের আন্তঃনগর ট্রেন প্রবাল ও সৈকত এক্সপ্রেসে সংযোজন হবে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাল ও সৈকত এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি সাধারণত দ্বিতীয় শ্রেনির কোচ দিয়ে যাত্রী পরিবহন করে। পর্যটন নগরীর যাত্রী পরিবহন হলেও ট্রেনটিতে সর্বোচ্চ ভালোমানের আসন শোভন চেয়ার। শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কোচ নেই। এ কারণে মহানগর এক্সপ্রেসের কোচগুলো ঈদের সময়ে ওয়ার্কশপে কাজ সম্পন্ন করে ঈদ-পরবর্তী যাত্রী পরিবহনে ট্রেনের বহরে যুক্ত করা হবে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন পর পূর্ণাঙ্গ আন্তঃনগর ট্রেনের সুবিধা পাচ্ছে সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম পরিচালক (অপারেশন) মো. শহিদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশন অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনার লক্ষ্য রয়েছে। সবগুলো ট্রেনে বাড়তি কোচ দেওয়া হচ্ছে।
'পাশাপাশি নতুন আমদানি করা কোচ দিয়ে নতুন রেক তৈরি করে প্রতিস্থাপিত রেকগুলো একাধিক পুরনো আন্তঃনগর ট্রেনে দেওয়া হচ্ছে। এতে আসন্ন ঈদের যাত্রায় যাত্রীরা আগের চেয়েও স্বস্তিতে ভ্রমণ করতে পারবেন,' বলেন তিনি।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, লোকমোগটিভ সংকট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব ট্রেন সচল রাখতে প্রয়োজন ৩ হাজারের বেশি কোচ ও প্রায় ৩০০ লোকোমোটিভ। কিন্তু বর্তমানে সচল কোচ রয়েছে ২ হাজারের কিছু বেশি এবং সচল ইঞ্জিন দুই শতাধিক। অনেকগুলো ইঞ্জিন ও কোচের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে।
পূর্বাঞ্চলে (চট্টগ্রাম) এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। পূর্বাঞ্চলে সচল রয়েছে ১ হাজার ১৩১টি কোচ ও ৭০টির কিছু বেশি ইঞ্জিন। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ঈদের ভিড়ের সময় বড় ধরনের শিডিউল বিপর্যয় এড়াতে অন্তত ৮৫টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, 'ঈদযাত্রা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রেলের সব বিভাগ কাজ করছে। প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন সংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করা যাবে।'
