ঈদে ৭ দিনের ছুটি শুরু, পরিবহনকেন্দ্রে বাড়ছে ঘরমুখো মানুষের চাপ
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। এতে লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল ও মহাসড়কজুড়ে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নেমেছে। রাজধানীর পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে যাত্রীর চাপ, তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
ঈদের আগে গতকাল (১৬ মার্চ) ছিল শেষ কর্মদিবস। ফলে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ফিরতে দেখা গেছে পুরোনো সেই ব্যস্ততা। একই সঙ্গে বাস টার্মিনালগুলোতেও ছিল যাত্রীদের আনাগোনা। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঘরমুখো যাত্রায় ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও বাড়তে শুরু করেছে যানবাহনের চাপ।
সোমবার (১৬ মার্চ) সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
সদরঘাটে লঞ্চ শ্রমিক, কুলি ও মজুরদের ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা সাত দিনের ছুটি শুরু হওয়ায় আজ (১৭ মার্চ) থেকে ঘাটে চাপ আরও বাড়বে।
সদরঘাট ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রীরা বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য ভিড় করছেন। কুলি-মজুরদের উপস্থিতিও আগের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যাই বেশি। ঈদের ভিড় এড়াতে অনেকে আগেভাগেই যাত্রা শুরু করেছেন।
সাধারণ সময়ে বরিশাল রুটে এক বা দুটি লঞ্চ চলাচল করলেও এখন যাত্রীর চাহিদা বাড়ায় চারটি করে লঞ্চ ছাড়ছে। আজ থেকে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লঞ্চ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেক ভাড়া ৩০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২ হাজার ৪০০ টাকা। ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ঢাকা থেকে মুলাদি ও ভাসানচর রুটে ডেক ভাড়া ৪০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। চাঁদপুর রুটে ডেক ভাড়া ২০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।
চাঁদপুরগামী আল বোরাক লঞ্চের টিকিট বিক্রেতা জমির উদ্দিন জানান, এখনো ডেকে যাত্রীর চাপ কম থাকলেও কেবিনে কিছু যাত্রী রয়েছে। তিনি বলেন, "আজ থেকে যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে।"
চরফ্যাশনগামী একটি লঞ্চের স্টাফ আবদুল বলেন, "ঈদের সময় ছাড়া বছরের অন্য সময় লঞ্চগুলো প্রায় ফাঁকাই থাকে। তাই ঈদকে ঘিরেই কিছুটা ব্যস্ততা ফিরে আসে।"
পরিবার নিয়ে বরিশাল যাচ্ছিলেন যাত্রী সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, "ভিড় এড়াতে আগেভাগেই বাড়ির পথে রওনা হয়েছি। ভাড়া আগের মতোই রয়েছে।"
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলে সড়কপথে যাতায়াত বেড়ে যাওয়ায় সদরঘাটের ব্যস্ততা আগের তুলনায় কমেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে ঈদসহ বড় উৎসবের সময় আবারও সেই পুরোনো কর্মব্যস্ততা ফিরে আসে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, "ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে নতুন ট্রলি সরবরাহ করা হয়েছে। শেষ কর্মদিবসে ভিড় কিছুটা বেড়েছে। তবে সেতু চালুর পর সাধারণ সময়ে আগের মতো চাপ আর থাকে না।"
এদিকে গাবতলী বাস টার্মিনালে সোমবার দুপুর পর্যন্ত যাত্রীর ভিড় তেমন দেখা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চাপ বাড়বে।
টার্মিনালের বিভিন্ন কাউন্টারের কর্মকর্তারা জানান, ১৭, ১৮ ও ১৯ মার্চের অগ্রিম টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তবে যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বিআরটিএ, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ে একটি ভিজিল্যান্স টিম অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সাহা বলেন, "যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।"
সাকুরা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার ফারুক হোসেন জানান, "১৭ থেকে ১৯ মার্চের অগ্রিম টিকিট শেষ। তবে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে।"
মহাখালী বাস টার্মিনালে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। কাউন্টারগুলোতে নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট বিক্রি হচ্ছে।
গাইবান্ধাগামী যাত্রী আব্দুল আলীম বলেন, "পাঁচ দিন আগে টিকিট কেটেছি। এখন টিকিট পাওয়া যায় না। ভাগ্য ভালো থাকলে স্ট্যান্ডিং বাসে ওঠার সুযোগ মেলে। ভাড়া ৭৫০ টাকা নিচ্ছে, আগে ৬০০ টাকায় যাওয়া যেত।"
তবে কাউন্টারে প্রদর্শিত ভাড়ার তালিকায় গাইবান্ধার ভাড়া ৭৫০ টাকাই নির্ধারিত রয়েছে।
এ বিষয়ে বাসচালক শফিকুল বলেন, "ভাড়া আগেও একই ছিল। তবে যাত্রী কম থাকলে কিছুটা ছাড় দেওয়া হতো। ঈদের সময় গাড়ি খালি ফেরে, তাই ভাড়া কমানো সম্ভব হয় না।"
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঘরমুখো যাত্রায় ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও যানবাহনের চাপ বাড়ছে। সোমবার দুপুরের পর থেকে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিকেল ৪টার পর থেকে যানবাহনের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। সন্ধ্যা ও আজ ভোরে চাপ আরও বাড়তে পারে।
হাসাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম মাহামুদুল হক জানান, এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দুটি মোবাইল টিম ও চারটি পেট্রোল টিমসহ ছয়টি দল কাজ করছে।
তিনি বলেন, "নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে।"
উল্লেখ্য, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবার টানা সাত দিনের ছুটি পাচ্ছেন। সরকার ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঈদের ছুটি ঘোষণা করেছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ বা ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে।
