চট্টগ্রামে ৭ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করল ছাত্রদল নেতা
চট্টগ্রামে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের আওতায় সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সাবেক সমন্বয়কারী, যিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদানের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই মামলা করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কাজী মিজানুর রহমানের আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলার বাদী মো. রিদুয়ান ওরফে রিদুয়ান সিদ্দিকী নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ফটিকছড়ির নানুপুরের আবদুর রহিমের ছেলে।
মামলায় অভিযুক্ত সাত সাংবাদিক হলেন— চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসেন তৌফিক ইফতিখার; যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার; সমকালের সিনিয়র সহযোগী সম্পাদক নাসির উদ্দিন হায়দার; চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি রতন কান্তি দেবাশীষ; বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী; চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও আজকের পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সবুর শুভ; এবং চ্যানেল আইয়ের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ।
তাদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২৬(১) এবং ২৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, যা সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
সাংবাদিকদের মধ্যে এই মামলাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে, কারণ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম সাইবার মামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আগের উত্তেজনা
হোসেন তৌফিক ইফতিখার নিরাপত্তা চেয়ে কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার কয়েকদিন পর এই মামলাটি হলো।
জিডিতে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ৫ মার্চ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে এক বৈঠকের সময় রিদুয়ান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি দল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।
জিডিতে বলা হয়, সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও রিদুয়ান এই হামলার নেতৃত্ব দেন। আরও দাবি করা হয়, ঘটনার পর তিনি এবং তার সহযোগীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিয়ে মানহানিকর তথ্য ছড়িয়েছেন এবং শারীরিক লাঞ্ছনার হুমকি দিয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিচয়
চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি রিদুয়ান সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজন ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দেন। সে সময় চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের নবনির্বাচিত এমপি সরওয়ার আলমগীর (যার নির্বাচনের ফলাফল আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে) তাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন।
সেখানে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার হোসেন রুবেলও উপস্থিত ছিলেন।
তখন থেকে বেশ কিছু সূত্র জানায় যে, রিদুয়ান নিজেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন।
এর আগেও রিদুয়ান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
গত বছরের ১ জুলাই তার নেতৃত্বে একদল লোক এক ছাত্রলীগ নেতাকে পটিয়া থানায় নিয়ে যায় এবং সেখানে পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনেই তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার সময় একদল লোক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে থানায় প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়।
এতে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূরসহ অন্তত চার পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে।
সাংবাদিকরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, গত বছরের ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব জোরপূর্বক দখলে রিদুয়ান ও তার সহযোগীরা জড়িত ছিলেন। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে জুয়া খেলার আয়োজন চলত বলে খবর পাওয়া গেছে।
কিছু সাংবাদিক মনে করছেন, বর্তমান মামলাটি সেই বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিন্দা
তিনটি সাংবাদিক সংগঠন এই মামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহারসহ রিদুয়ান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে বিএফইউজে সহ-সভাপতি শহীদুল আলম, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, সাধারণ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তারা বলেন, 'একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনেও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীগুলো বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে।'
নেতৃবৃন্দ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
