২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কমেছে ২,৫৮৮ জন
ব্যাংকখাতে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিতভাবে বাড়লেও, ২০২৫ সালজুড়ে এটি হ্রাসের প্রবণতা দেখিয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকখাতের মোট নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কমেছে ২ হাজার ৫৮৮ জন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একাধিক ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার পাশাপাশি অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন।
রিপোর্টে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বড় পতন হওয়ার পর বছরের শেষ ছয় মাসেও (জুলাই–ডিসেম্বর) নারী জনবল ৭২১ জন কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জেন্ডার ইক্যুইটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকখাতে মোট নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৬১ জন, যা একই বছরের জুন শেষে ছিল ৩৫ হাজার ৭৮২ জন। যদিও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৬৪৯।
ব্যাংকের ধরনভেদে জনবল কাঠামোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকলেও, পুরুষের তুলনায় নারী অংশগ্রহণের হারে বিদেশি ব্যাংকগুলো এগিয়ে।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে নারী কর্মীর সংখ্যা ২২ হাজার ৯৮৩ জন, যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মোট জনবলের ১৬.১৩%। তবে ব্যাংক খাতে মোট নারী জনবলের ৬৬% এখানে কর্মরত।
ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নারী কর্মী রয়েছেন ৯ হাজার ১৪৭ জন, যা এই ব্যাংকগুলোর মোট কর্মীর ১৬.৯০%। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে কম ৯৮৪ জন হলেও অংশগ্রহণের হার অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় বেশি—২৫.০৩%।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৪২৭ জন, যার মধ্যে নারীর অংশ ১৬.৫০ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকে নারী জনবল সামান্য কমেছে। তবে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- জানান, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেসব ব্যাংকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নারী-পুরুষ কর্মী স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।
তিনি কারণ হিসেবে বলেন, 'গত এক বছরে বেশ কিছু ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ধরা পড়েছে। এ কারণে অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, একই সময়ে নতুন নিয়োগও কম হয়েছে।'
বিভিন্ন পদে নারীদের অংশগ্রহণের হার নিম্নরূপ:
ব্যাংকের বোর্ড সদস্য হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ১৩.১১ শতাংশ। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে অংশগ্রহণ সর্বোচ্চ (১৬.৯৫%) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সর্বনিম্ন (৩.৬৪%)।
ব্যাংকিং খাতে প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ১৭.০৭ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৬.১৯ শতাংশ হলেও উচ্চ পর্যায়ে তা কমে ১০.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
পঞ্চাশ বছরের বেশি বয়সী নারী কর্মকর্তাদের হার ১০.৯২%, যেখানে ৩০ বছরের কম বয়সী নারী কর্মকর্তাদের হার ২১.২২%।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের হার (এমপ্লয়ি টার্নওভার) অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি, যা প্রায় ২৯.৫৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকখাতে এই হার ১৭.০৭%।
বর্তমানে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর রয়েছে। সব ব্যাংকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা কার্যকর থাকলেও মাত্র ৩৮টি ব্যাংক এবং ৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ৩৮টি ব্যাংক নারী কর্মীদের জন্য যাতায়াত সুবিধা প্রদান করছে।
