বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে ও লোডশেডিং এড়াতে বকেয়া বিল পরিশোধের দাবি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে যে, অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে এবারের গ্রীষ্মে দেশজুড়ে লোডশেডিং দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটির বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন অস্থির। এমন সময়ে বকেয়া টাকা না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হিমশিম খাচ্ছে।
গতকাল (৯ মার্চ) রাজধানীতে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সংগঠন বিপ্পা আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন বিপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম।
বিপ্পা জানায়, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের মোট বকেয়া পাওনা এখন প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপুল পরিমাণ এই বকেয়ার কারণে কোম্পানিগুলোর পক্ষে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংগঠনটির তথ্যমতে, বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা। কিন্তু এখন এই অর্থ পরিশোধে ১৮০ থেকে ২৭০ দিন পর্যন্ত দেরি হচ্ছে।
এই দীর্ঘ বিলম্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারীদের ওপর তীব্র আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে জ্বালানি সংগ্রহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা তাদের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
ইমরান করিম বলেন, 'পাওনা পরিশোধ করা হলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেও জ্বালানি আমদানি করা যাবে।'
এ সমস্যা সমাধানে বর্তমান সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকারের মতো একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিপ্পা।
ইমরান করিম বলেন, বকেয়া পাওনা আংশিক পরিশোধের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করেছিল।
তিনি বলেন, ওই উদ্যোগ এবং পরবর্তীতে নিয়মিত বিল পরিশোধের ফলে বিদ্যুৎ খাত স্থিতিশীল হয়েছিল এবং গত গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।
বিপ্পার সাবেক এই সভাপতি বলেন, 'এর ফলে গত বছরের গ্রীষ্মে বড় কোনো লোডশেডিং হয়নি।' বর্তমান সরকারও বন্ড ইস্যু করে অথবা প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বকেয়া মিটিয়ে এ বছরের সম্ভাব্য সংকট এড়াতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্থাপিত সক্ষমতার চেয়ে কার্যকর উৎপাদন সক্ষমতা কম
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও এর একটি বড় অংশ জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য পরিচালন সীমাবদ্ধতার কারণে অলস পড়ে আছে বলে জানান বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা।
বিপ্পার তথ্যানুসারে, অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া আরও ১ হাজার ৬২৬ মেগাওয়াট সক্ষমতা বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বন্ধ রয়েছে।
এর পাশাপাশি রাতে সৌরবিদ্যুৎ না পাওয়া এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে অনেক ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইমরান করিম জানান, এর ফলে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় দেশের কার্যকর উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ হাজার ৬২৭ মেগাওয়াটে। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে প্রকৃত উৎপাদন সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।
বিদ্যুতের দামের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে জ্বালানি খরচ
ইমরান করিম আরও বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়েছে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ছয় বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ, কিন্তু বিদ্যুতের দাম সেই হারে বাড়েনি।
এই সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৫৫ শতাংশ, যা কেন্দ্র পরিচালনাকারীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে বাংলাদেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশই আবাসিক, বাণিজ্যিক ও কৃষি খাতে ব্যয় হয়। এসব খাতে গত ছয় বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে মাত্র ৫৪ শতাংশ।
ফলে খুচরা মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও বাড়বে।
উৎপাদন খরচের ওপর চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির ওপর থেকে সাময়িকভাবে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিপ্পা।
সুনির্দিষ্টভাবে সংগঠনটি আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ওপর ৩৪ শতাংশ এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর ২২ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিপ্পার মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যখন অস্থির, তখন এ ধরনের পদক্ষেপ উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
গ্যাস সংকটে ব্যাহত বিদ্যুৎ উৎপাদন
বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাতও বলেন, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে এবারের গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
তিনি বলেন, 'চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।'
হাসনাত আরও জানান, গ্যাস সংকটে এখন দেশের প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্বল্প মেয়াদে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোও কঠিন।
'গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কোনো তাৎক্ষণিক সুযোগ নেই এবং আমদানি সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও সীমিত,' বলেন তিনি।
জ্বালানির মজুত থাকতে পারে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত
ইমরান বলেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানির মজুত রয়েছে। তবে কেন্দ্রভেদে ব্যক্তিগত মজুতের ওপর ভিত্তি করে এই পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তিনি বলেন, 'এই কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং সময়মতো বিল পরিশোধ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।'
উৎপাদন খরচ কমানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইমরান বলেন, ফার্নেস অয়েল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা ইতিমধ্যে বেশ কিছু ছাড় দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি আমদানির ওপর সার্ভিস চার্জ ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছিল, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা মেনে নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, গত নয় মাস ধরে বিল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা বিলম্বিত পাওনার ওপর কোনো সুদ দাবি করছেন না।
ইমরান বলেন, 'অন্যান্য খাতের অনেক সরবরাহকারী বিল না পেয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দিলেও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিপুল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে।'
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে সহযোগিতা করতে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান হাসনাত।
তিনি বলেন, 'স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে আমরা সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। সর্বোপরি, দেশ বাঁচলে আমরা সবাই বাঁচব।'
