‘আর্থিক চাপের’ কারণে হাসিনা আমলের বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ সরকারের
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে স্বাক্ষরিত সমস্ত বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এসব চুক্তির অনেকগুলোতেই জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বেশ কিছু চুক্তি অনুমোদন করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাত উচ্চ ব্যয় ও কঠিন সব শর্তের জালে আটকা পড়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, 'বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিবিড়ভাবে জড়িত। আমরা এই সার্বভৌমত্ব কিছু মানুষের (বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) হাতে তুলে দিয়েছিলাম। এখন এই চুক্তিগুলোর ওপর আমাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।'
'সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনা' বলতে মন্ত্রী বিগত সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো (পিপিএ) পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ন্যায্য শর্ত নিশ্চিত করাকে বুঝিয়েছেন। বিদ্যুৎ চুক্তি-সংক্রান্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি) এবং এই খাত সংশ্লিষ্টরা এসব চুক্তিকে একপাক্ষিক বলে অভিহিত করেছেন।
এনআরসি তাদের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বেশ কিছু চুক্তি প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটের মানসিকতা থেকে করা হয়েছে।
তবে টুকু স্বীকার করেন, যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশি কেন্দ্রের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আইনি লড়াইয়ের ঝুঁকি থাকে।
বিবাদের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, 'সমাধান খোঁজার জন্য বিদ্যুৎ খাতের সমস্ত দেশবিরোধী চুক্তি পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা তাদের সাথে আলোচনায় বসব।'
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।
গতকাল বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসানাত টিবিএসকে বলেন, 'বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে বিপ্পা সরকারকে সহযোগিতা করবে।'
তিনি স্বীকার করেন, কিছু চুক্তি অন্যায্য মনে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'কিছু চুক্তি যে অসম ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একই মানের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে একটি কেন বেশি দাম পাবে আর অন্যটি কেন কম? এই বৈষম্যগুলো অবশ্যই দূর করতে হবে।'
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে মত দেন। তিনি টিবিএস-কে বলেন, 'আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এটি করা হলে আমি কোনো ভুল দেখি না। এই প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই এখন সম্পন্ন হয়ে গেছে।'
খাত-সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড় উৎপাদন খরচ কেবল জ্বালানি মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তারা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ বিপুল পরিমাণ নির্ধারিত ব্যয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন।
একইভাবে, যেসব গ্যাসচালিত কেন্দ্র কম প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে চলেছে, সেগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও তুলনামূলক বেশি ছিল। এতেও বিশাল অঙ্কের নির্ধারিত ব্যয় হয়। গত কয়েক বছরে 'রিজার্ভ মার্জিন' বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, যা আর্থিক চাপ আরও তীব্র করেছে।
উৎপাদনকারীদের দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির কথা উল্লেখ করে টুকু বলেন, 'বিদ্যুৎ খাতে অনেক খারাপ চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তিকে সার্বভৌম গ্যারান্টি সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। আমরা চাইলেই ইচ্ছামতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ে জড়ানোর চেয়ে আলোচনার টেবিলে বসে এ খাতের সংকট নিরসন করা অনেক বেশি বিচক্ষণতার কাজ হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক অভিহিত করে মন্ত্রী বলেন, 'বর্তমানে পুরো খাতটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক সংকট, অনিয়ম ও দুর্নীতি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিবিড়ভাবে জড়িত। অথচ আগের সরকার এই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে একের পর এক দেশবিরোধী চুক্তি করেছে। আমি সেই সার্বভৌমত্ব দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। এটাই আমার মূল লক্ষ্য।'
এনআরসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-এর আওতায় স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদি পিপিএগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে এবং এগুলো রাজস্ব ও বিদ্যুতের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সক্রিয় সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশ এক ধরনের অনড় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আরেক ধরনের অনড় অবস্থায় আটকা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে—যেখানে স্বেচ্ছাচারী শাসনের জায়গা নেবে কঠোর সব চুক্তি। আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকবে এবং দেনার পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে সংশোধনের সুযোগও সময়ের সাথে সংকুচিত হয়ে আসবে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নীতিনির্ধারকদের কঠিন সব সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আগ্রাসী একতরফা পদক্ষেপ আইনি বিরোধ, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা ও স্বল্পমেয়াদি সংকটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পাশাপাশি কমিটি সতর্ক করে বলেছে, কোনো পদক্ষেপ না নিলে তা অব্যাহত আর্থিক ক্ষরণ, সক্ষমতা হ্রাস ও উন্নয়নের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
বর্তমান অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরে টুকু বলেন, রমজান, আসন্ন গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।
তিনি বলেন, 'দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো রমজান, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। আমরা এ লক্ষ্যে পরিকল্পনা করছি এবং শীঘ্রই তা ঘোষণা করা হবে।'
নিজের দীর্ঘমেয়াদিদ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, 'বিদ্যুৎ খাতে আমাদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হবে সবুজ। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেব।'
বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ও ভর্তুকির চাপ সম্পর্কে জানতে চাইলে টুকু বলেন, 'এত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভর্তুকি কমানো নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না। আমাদের সরকারের বয়স মাত্র ছয় দিন—এখনই আমরা এ বিষয়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত দেব?'
মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অবস্থা নিয়ে তিনি অকপটে বলেন, 'আমার মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই বিশাল ঋণের চাপে নিমজ্জিত। বকেয়ার এই পাহাড় একদিনে তৈরি হয়নি। হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে তারা কী করেছে, আপনারাই বলুন। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা চলছে।'
