বন্দীদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাতে ইন্টারকম সুবিধা চালু করছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জরাজীর্ণ ও কোলাহলপূর্ণ সাক্ষাৎ কক্ষে বন্দীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে চালু হচ্ছে ইন্টারকম টেলিফোন সুবিধা। ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা লোহার জালের দুই পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলার পুরোনো দৃশ্য বদলে দিতে প্রথমবারের মতো এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে।
বেসরকারি সংস্থা আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্দীরা স্বজনদের সঙ্গে নিরিবিলি ও স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহে প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি)।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২ হাজার ২৪৯ বন্দীর ধারণক্ষমতার এই কারাগারে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজারের বেশি বন্দী থাকেন। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি বন্দী থাকায় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। একসঙ্গে অনেক মানুষ কথা বলায় কেউ কারও কথা স্পষ্ট শুনতে পান না, যা মানবিক দিক থেকে কষ্টকর।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে ৩২টি ইন্টারকম সেট বসানো হচ্ছে। এতে একসঙ্গে ১৬ জন বন্দী কথা বলতে পারবেন। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ১২টি এবং নারী বন্দীদের জন্য ৪টি বুথ রাখা হয়েছে। উদ্বোধনের পর আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সেবাটি চালু হবে।
উদ্যোক্তারা জানান, উন্নত বিশ্বের কারাগারগুলোতে ইন্টারকম ব্যবস্থা থাকলেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এটি প্রথম উদ্যোগ। বর্তমানে একজন বন্দী মাসে দুইবার ৩০ মিনিট করে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। তবে হট্টগোলের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কথাও ঠিকমতো বলা যায় না।
নতুন ব্যবস্থায় কাঁচের দেয়ালের দুই পাশে বসে টেলিফোনে কথা বলা যাবে। এতে বন্দীদের মানসিক স্বস্তি বাড়বে এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। চট্টগ্রামে ইতিবাচক ফল মিললে ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য কারাগারেও এই সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি কারা পরিদর্শক ও আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মু. নাছির উদ্দিন বলেন, "চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সাক্ষাৎ কক্ষের বর্তমান চিত্র অত্যন্ত অমানবিক। লোহার জালের দুই পাশে প্রায় দুই ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হয়। চারপাশের প্রচণ্ড চিৎকারে কেউ কারও কথা স্পষ্ট শুনতে পারেন না। মাসে মাত্র দুইবার ৩০ মিনিটের সুযোগ মিললেও এই শোরগোলের কারণে জরুরি আলাপ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।"
তিনি বলেন, কারাগারের তিনটি ফ্লোরেই এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বন্দীদের মানবিক যোগাযোগ সহজ করতেই ইন্টারকম ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষও এ উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
কারাগারের সিনিয়র জেলা সুপার মো. ইকবাল হোসেন টিবিএসকে বলেন, "ঊর্ধ্বতন কারা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ইন্টারকম সিস্টেম স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। মূলত বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে আসা স্বজনদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কথা বলতে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে হয়। এতে অনেক সময় কেউ কারও কথা স্পষ্টভাবে শুনতে বা বুঝতে পারেন না।"
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ইন্টারকম ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়া টিবিএসকে বলেন, "চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ইন্টারকম ব্যবস্থাটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথমবার চালু হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বন্দীরা যেন কোনো বিঘ্ন ছাড়াই স্বজনদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন। এই উদ্যোগ সফল ও জনবান্ধব প্রমাণিত হলে দেশের অন্যান্য কারাগারেও তা সম্প্রসারণ করা হবে।"
তিনি মনে করেন, আধুনিক এই যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্দীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে 'স্বজন' প্রকল্পের আওতায় সীমিত পরিসরে বন্দীদের মুঠোফোনে কথা বলার সুযোগ চালু হয়েছিল। তবে সাক্ষাৎ কক্ষে সরাসরি ইন্টারকম ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি বন্দীদের সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কারা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ডিজিটাল উদ্যোগ কারাগারকে কেবল বন্দিশালা নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
কারাগারে স্বজন-সাক্ষাতে আসছে অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বজন-সাক্ষাৎ প্রক্রিয়া সহজ করতে অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট চালুর প্রস্তাব কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) বরাবর পাঠিয়েছে আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দর্শনার্থীরা ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে আগে থেকেই সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করতে পারবেন। এতে ভোরে এসে লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা কমবে এবং নির্ধারিত সময়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করা যাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় সাক্ষাৎ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ভিড় কমবে। বন্দীদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ আরও মানবিক ও ঝামেলামুক্ত করতেই এই আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সফল হলে এটি কারাগারের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাবে।
