বিপুল বকেয়ার কারণে রমজান ও গরমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে: বিপ্পা
বকেয়া বিলের পরিমাণ বাড়তে থাকায় চলতি রমজান ও আসন্ন তীব্র গরমের সময় দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) গতকাল (১৯ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছে, বর্তমানে বকেয়া পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩-১৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের বকেয়া জমা হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত 'পাওয়ার ইন্ডাস্ট্রি ব্রিফ অ্যান্ড ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেশন' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, গত বছরের জুলাই থেকে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা নিয়মিত পেমেন্ট পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, 'গত বছরের জুলাই থেকে আমরা বিদ্যুৎ বিলের নিয়মিত পেমেন্ট পাচ্ছি না। তা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'
হাসনাত আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আট থেকে দশ মাসের বিল বকেয়া পড়ে আছে। এর ফলে কোম্পানিগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং নতুন করে অর্থায়ন জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে।
'বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো ঋণপত্র খুলতে সহযোগিতা করছে না,' বলেন তিনি।
বিদ্যুৎ সরবরাহে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, 'বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া থাকায় পবিত্র রমজান ও গ্রীষ্মকালে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।'
বিপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই পেমেন্ট সংকট দেখা দেয়।
তিনি উল্লেখ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বকেয়া সমন্বয়ের জন্য দুই দফায় বন্ড ইস্যু করেছিল; কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত চার মাসের বিল বকেয়া থেকে যায়। এরপর থেকে বকেয়া পরিশোধের সমস্যাটি আবারও প্রকট হয়েছে বলে জানান ইমরান করিম।
বিপ্পার তথ্যমতে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বকেয়া পাওনার একটি অংশ পরিশোধ করেছিল। এর ফলে বকেয়া বিলের পরিমাণ কমে প্রায় তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে জুলাইয়ের পর থেকে অর্থ পরিশোধের গতি আবারও ধীর হয়ে গেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে ডেভিড হাসনাত অভিযোগ করেন, বিল নিষ্পত্তির পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারার অজুহাতে উৎপাদনকারীদের ওপর লিকুইডেটেড ড্যামেজ-সহ (এলডি) বিভিন্ন জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এই পদক্ষেপটি এমনভাবে নেওয়া হয়েছে যা লোডশেডিং নিয়ে নতুন সরকারকে সংকটে ফেলতে পারে। একইসঙ্গে বিদেশি ও দেশি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
এই বিরোধের মূলে রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), যারা ২০২২ সাল থেকে চুক্তিবদ্ধ বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর এলডি আরোপ করে আসছে।
বিপ্পা বলছে, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) আওতায়, বিল জমা দেওয়ার ৪০ দিনের মধ্যে পিডিবিকে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা আইনত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বাধ্য নয়।
গত ২ ফেব্রুয়ারি বিপিডিবি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য জরিমানা ও অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সুদে-আসলে আদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইমরান করিম বলেন, জরিমানা হিসেবে কোনো অর্থ কর্তন করতে হলে অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, 'যেহেতু সময়মতো পাওনা পরিশোধ করা হয়নি, তাই এখানে জরিমানা কাটার কোনো সুযোগ নেই।'
এদিকে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিপ্পা নেতারা। ইমরান করিম জানান, গত বুধবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা বছরের এই সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। এটি আগামী মাসগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর আরও প্রচণ্ড চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডেভিড হাসনাত বলেন, 'আমরা নতুন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করতে চাই। তবে সরকারের প্রত্যাশা এবং আমাদের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।'
