রেলের সক্ষমতা সংকট: চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের চাপ বেড়েছে
প্রয়োজনীয় মালবাহী কনটেইনার, লোকোমোটিভ ও জনবলের ঘাটতিতে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) কনটেইনার জট তীব্র হয়েছে। বন্দর সূত্র জানায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন এবং পরে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিঘ্নে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
লাগাতার আন্দোলনের কারণে মাসের শুরুতে সিজিপিওয়াইয়ে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১,৮৩১ টিইইউসে দাঁড়ায়। বর্তমানে কমে ১,৩৫২ টিইইউস হলেও তা ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৫০০ টিইইউস বেশি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্দোলনের পর নির্বাচন এবং সামনে রমজানের শেষে যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে কনটেইনারের স্তুপ আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমরা বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু রেলের সক্ষমতার ঘাটতির কারণে সবসময় জট থাকে। রমজানের শেষে চাপ আরও বেড়ে যায়। আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও রেলের সক্ষমতা কমেছে। চাহিদামতো ট্রেন না চলায় ধীরগতির কারণে আমদানি-রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত পোর্ট চার্জ বহন করতে হয়। সময়মতো পণ্য পরিবহনও করা যায় না।'
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে দৈনিক ২০০ একক কনটেইনার পরিবহনের জন্য চারটি ট্রেন চালুর অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। রমজানে যাত্রীসেবায় জোর দিলে পণ্য পরিবহন খাত আরও সংকুচিত হয়।
সিজিপিওয়াই সূত্র জানায়, ইয়ার্ডটির মোট কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৮২৫ একক। সোমবার বিকাল পর্যন্ত সেখানে ১,৩৫২ একক কনটেইনার রয়েছে। আরও চারটি ট্রেন প্রস্তুত রাখা হলেও ইঞ্জিন না পাওয়ায় সময়সূচি নিশ্চিত করা যায়নি। প্রতিটি ট্রেনে প্রায় ২০০ কনটেইনার ঢাকায় পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুটি কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল করছে। কোনো দিন তিনটি, আবার কোনো দিন একটিও চলেনি। এক বছর আগেও এ রুটে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি ট্রেন চলত। ইঞ্জিন ও জনবল সংকটে ট্রেনের সংখ্যা কমেছে।
সিজিপিওয়াই থেকে জ্বালানি তেল, পাথর, খাদ্যশস্য ও শিল্প কাঁচামাল পরিবহনে মোট ১৫টি ইঞ্জিনের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে নিয়মিত পাওয়া যায় সাতটি। শুধু কনটেইনারবাহী ট্রেনের জন্য সাতটি ইঞ্জিনের চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র দুটি।
চট্টগ্রাম ডিপো থেকে ঢাকা আইসিডিতে কনটেইনারবাহী ট্রেন ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার বেগে চলে। ফলে পৌঁছাতে ১৮ থেকে ২২ ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিটি ট্রেনে ৪০ ফুটের ৩২টি বা ২০ ফুটের ৬৪টি কনটেইনার বহন করা যায়। ট্রেন কম চলায় সিরিয়াল পেতে এখন এক সপ্তাহ সময় লাগছে, যেখানে আগে লাগত দুই দিন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম টিবিএসকে বলেন, '১,৮০০-এর বেশি একক কনটেইনার থেকে তা কমে ১,৩০০-তে নেমে এসেছে। রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয় উল্লেখ করে রেলওয়েকে চিঠি দিয়েছি। দৈনিক ২০০ একক কনটেইনার পরিবহনের চাহিদা জানিয়েছি। এখনো কোনো ফিডব্যাক পাওয়া যায়নি।'
রেলওয়ের পরিবহন ও যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, সব ট্রেন সচল রাখতে প্রয়োজন তিন হাজারের বেশি কোচ ও প্রায় ৩০০ লোকোমোটিভ। বর্তমানে রেলে আড়াই হাজারের বেশি কোচ ও তিন শতাধিক ইঞ্জিন থাকলেও সব সচল নয়। ৫০ শতাংশের বেশি ইঞ্জিন ও কোচের আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে। বর্তমানে সচল কোচ রয়েছে দুই হাজারের কিছু বেশি এবং সচল ইঞ্জিন দুই শতাধিক।
সিজিপিওয়াই পূর্বাঞ্চলের অধীন। পূর্বাঞ্চলে সচল রয়েছে ১,১৩১টি কোচ ও ৭৬টি ইঞ্জিন। সব ট্রেন চালাতে ন্যূনতম ১১৬টি ইঞ্জিন ও ১,৫০০ কোচ প্রয়োজন।
রেলওয়ের তথ্যমতে, গত এক যুগে রেলওয়ের উন্নয়নে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে গত এক দশকে বহরে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৮০০ কোচ ও মাত্র ৩০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন)। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া কেনা ভারী এসব ইঞ্জিন পুরোনো রেলসেতুতে চলাচল করতে পারে না। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
নতুন করে আরও ৩০০টি ইঞ্জিন আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। রেলপথ নির্মাণ হলেও পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে সরকারকে বছরে ২,০০০ কোটির বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানিকৃত কনটেইনারের মাত্র ২ শতাংশ রেলপথে, ১ শতাংশের কম নৌপথে এবং বাকি ৯৭ শতাংশ সড়কপথে পরিবহন হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলপথে আমদানি-রপ্তানি ও খালি মিলিয়ে ৮৮ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে। এসব কনটেইনারে ইস্পাতপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক পণ্য থাকে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯২ হাজার ৮২৮টি কনটেইনারে ৮ লাখ ২৬ হাজার ৩৩২ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ হাজার ৭১৯টি কনটেইনারে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন হয়েছে।
রেলের পূর্বাঞ্চলের আয়ের বড় অংশ আসে পণ্য পরিবহন থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১৫২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে কনটেইনার পরিবহন থেকে এসেছে ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে মোট আয় ছিল ১৫৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
রেলওয়ের প্রধান অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্বাঞ্চল) মো. শহীদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'রোলিং স্টক সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন বাড়ানো যাচ্ছে না। তবে এখন কোনো কোনো দিন চারটি ট্রেনও চলছে। রমজানেও পণ্য পরিবহন সেবা স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'
