অভিযান–জরিমানা সত্ত্বেও থামানো যাচ্ছে না চট্টগ্রামের অসাধু ব্যবসায়ীদের
চট্টগ্রাম বিভাগে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ধারাবাহিক অভিযান ও বিপুল অঙ্কের জরিমানা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি।
গত সাড়ে চার বছরে বিভাগজুড়ে ১৪,০৫৪টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত করা হয়েছে। তবু বাজারে ঠেকানো যাচ্ছে না অনিয়ম-দুর্নীতি।
বিভাগীয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে মোট ১৫ কোটি ৭৮ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ কোটি ৮৯ লাখ ৬৬ হাজার ৫৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। বাকি ১১ লাখ ১১ হাজার ৬৫০ টাকা আইন অনুযায়ী অভিযোগকারীরা পেয়েছেন।
প্রচলিত বাজার ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন করে দেখা দিয়েছে অনলাইন প্রতারণা। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ছে। অনেক অভিযোগই নাম-পরিচয়হীন বা ভুয়া ঠিকানায় পরিচালিত ফেসবুক পেজ ও অনলাইন দোকানের বিরুদ্ধে। গ্রাহকরা পণ্য অর্ডার করে নিম্নমানের পণ্য পাচ্ছেন, অথবা টাকা দিয়েও পণ্য পাচ্ছেন না।
তদন্তে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বা সঠিক ঠিকানা খুঁজে পায় না ভোক্তা অধিদপ্তর। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না থাকায় দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া বা ভোক্তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনলাইন প্রতারণা বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতায় ঘাটতি
বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো খাদ্যে ভেজাল রোধ।
বিভাগীয় উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ টিবিএসকে বলেন, "সমস্যাটি আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলা যায়। যেখানে ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে, সেসব ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা চাপ প্রয়োগ করছি, আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। চেষ্টা করছি এসব অপরাধ ন্যূনতম পর্যায়ে সীমিত রাখতে। দায়িত্ব অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি।"
খাদ্যে ভেজাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এটি শুধু কোনো চক্র বা সিন্ডিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ব্যক্তিগত বিবেক ও মানসিকতার বিষয়ও জড়িত। এটি আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র। যেমন—একজন বাবুর্চি বিয়ের অনুষ্ঠানে রান্না করতে গিয়ে কেওড়া জল, গোলাপ জল বা কৃত্রিম রং ব্যবহার করছেন। এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই, আছে মানসিকতার সমস্যা। খাদ্য প্রস্তুতকারীদের গুণগত মান ও সচেতনতার অভাবই বড় কারণ।"
মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "একজনকে সচেতন করা গেলেও প্রতিনিয়ত নতুন মানুষ এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আজ যে সচেতন হলেন, কাল তার সেই সচেতনতা হারিয়েও যেতে পারে। তবুও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আইনের প্রয়োগ ও শাস্তির ভয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অপরাধ থেকে বিরত থাকছে।"
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর বিভাগীয় সংগঠক রাসেল উদ্দীন টিবিএসকে বলেন, "ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বিদ্যমান আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ না হওয়া এবং আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষ সুফল পাচ্ছে না। সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণা কার্যক্রমের অভাব এবং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বাজার তদারকি কার্যকর হচ্ছে না।"
তিনি বলেন, "নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সাময়িক অভিযান চালানো স্থায়ী সমাধান নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ একটি ধারাবাহিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। ক্যাব বর্তমানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তাদের অভিযানে ক্যাবের স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নিচ্ছেন। তবে পরিস্থিতির টেকসই পরিবর্তনের জন্য শক্তিশালী চাপসৃষ্টি গোষ্ঠী গড়ে তোলা এবং জনগণের কণ্ঠস্বর জোরালো করার বিকল্প নেই।"
জনবল ও লজিস্টিক সংকট
অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগামহীন তৎপরতার বিপরীতে ভোক্তা অধিদপ্তরকে তীব্র জনবল ও লজিস্টিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বর্তমানে পুরো চট্টগ্রাম জেলার ১৪টি উপজেলার প্রায় এক কোটি মানুষের বাজার তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন সহকারী পরিচালক ও একজন অফিস সহকারী।
এত বড় এলাকায় সীমিত জনবল দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয় না থাকায় তদারকি কার্যক্রম বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। চন্দনাইশ বা সাতকানিয়ার মতো প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জেলা শহরে এসে অভিযোগ করা অনেকের জন্যই কষ্টসাধ্য। অন্যান্য সরকারি দপ্তরের মতো উপজেলা পর্যায়েও ভোক্তা অধিকার কার্যালয় থাকলে সেবা সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো।
চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এখন মানুষের আস্থার বড় জায়গা। এখানে কোনো ফি ছাড়াই মানুষ অভিযোগ জানাতে পারছেন ও প্রতিকার পাচ্ছেন। তবে এই আস্থার বিপরীতে আমাদের লজিস্টিক সংকট চরম। পুরো জেলায় মাত্র একজন কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহকারী দিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাতে হচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো অফিস সময় নেই, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়।"
অভিযান পরিচালনায় পুলিশি সহায়তা পাওয়াও বড় বাধা বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, "অভিযান পরিচালনায় পুলিশি সহায়তা পেতেও আমাদের বেগ পেতে হয়। রিজার্ভ ফোর্স না পেলে থানার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট কর্মএলাকা থাকায় এক থানার ফোর্স নিয়ে অন্য থানায় তাৎক্ষণিক অভিযান সম্ভব হয় না। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।"
বাজার তদারকি ও জরিমানা
গত পাঁচ বছরের (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় মোট ৬ হাজার ৯৩৯টি বাজার তদারকি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বাড়ায় সাধারণ ভোক্তারাও আগের চেয়ে সচেতন হয়েছেন।
এই সময়ে অধিদপ্তরে ৯ হাজার ২৪৬টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৬৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭৬(৪) অনুযায়ী, প্রমাণিত অভিযোগের জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে দেওয়া হয়। এ কারণে মানুষ এখন অধিকার আদায়ে বেশি সোচ্চার।
জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে জরিমানা আদায়ের পরিমাণে ভিন্নতা রয়েছে। জরিমানার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়। সেখানে ২ হাজার ৬৭০টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ কোটি ২৭ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
জেলা পর্যায়ে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২০৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা, কুমিল্লায় ১ হাজার ৬১৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ কোটি ৫৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা, চাঁদপুরে ২ হাজার ১০৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ কোটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং নোয়াখালীতে ১ হাজার ১৮৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে।
এছাড়া পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ১ হাজার ৪৬৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৯১ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ টাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ হাজার ৬৯৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৮৪ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা, ফেনীতে ৮৩৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৭৮ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা এবং লক্ষ্মীপুরে ৭৭৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে, সমতলের তুলনায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হওয়ায় পার্বত্য জেলাগুলোতে জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলক কম। খাগড়াছড়িতে ২৯৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ টাকা, রাঙামাটিতে ১৫২টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং বান্দরবানে ৪৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে।
