নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ৩২ আসনের ভোট পুনর্গণনার দাবি ১১ দলীয় জোটের
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল গণনায় প্রকাশ্যে কারচুপির অভিযোগ তুলে ৩২টি আসনের ফলাফল পুনর্গণনা দাবি জানিয়েছে ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট। জোটের শীর্ষ দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, 'ভোট গ্রহণকালীন সময়ে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে আমরা অসুস্থ পরিবেশের নানা দিক প্রত্যক্ষ করেছি। ভোট গ্রহণের সূচনা ভাল হলেও সমাপ্তি সুন্দর হয়নি।'
রোববার রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন বেল ১২টায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে ১১ দলীয় জোটের নেতারা।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, 'ত্রুটিগুলোসহ নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা কথা বলেছি। বিশেষ করে ৩২টি আসন চিহ্নিত করেছি, যেখানে অল্প ভোটের ব্যবধানে আমাদের হারানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছি।'
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, '৩২টি আসনে পুনর্মূল্যায়নের দাবি আছে। গ্যাজেট প্রকাশ হলেও আইনের তিন ধাপ আছে—ইসি, ট্রাইব্যুনাল, এরপর হাইকোর্টে রিট। আমরা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করব।'
ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, 'সংস্কার প্রশ্নে বলি—নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করেছে, এটা আমরা শুনেছি ও বিশ্বাস করতে চাই। তবে ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু হলেও ফলাফল ঘোষণা যদি স্বচ্ছ না হয়, সেখানে দায় এড়ানো যায় না। ইঞ্জিনিয়ারিং হলে তার দায় নির্বাচন কমিশনকেও নিতে হবে।'
তিনি বলেন, '১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের প্রথম ধাপ— নির্বাচনের কয়েকটি ধাপ আছে। প্রথমত ভোট গ্রহণ, দ্বিতীয়ত ভোট গণনা, তৃতীয়ত ফলাফল প্রকাশ। এই তিন ধাপের মধ্যে ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে অতীতের তুলনায় কিছু গুণগত পরিবর্তন আমরা দেখেছি। বড় ধরনের খুনাখুনি বা সহিংসতা তেমন দৃশ্যমান ছিল না। তবে এখানে প্রচুর জালভোট হয়েছে, কালো টাকার ছড়াছড়ি ছিল। কোথাও কোথাও হুমকি-ধমকি, সন্ত্রাস, মারামারি বা হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বড় ঘটনা না ঘটলেও, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো উপাদান তৈরি করেছে।'
গ্যাজেট প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১২ তারিখে নির্বাচন, ১৩ তারিখ রাত ১১টায় গ্যাজেট প্রকাশ। দূরবর্তী এলাকা থেকে কেউ অভিযোগ দাখিলের সুযোগই পেলেন না।
তিনি বলেন, 'আমরা কমিশনকে বলেছি—অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখুন। আইনের দরজা খোলা আছে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাব। তবে আমাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে—এ প্রশ্ন রয়ে গেল।'
কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, 'নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক। হাতিয়ার ঘটনার মতো উদাহরণ সামনে এসেছে। ২০১৮ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না—প্রশ্ন উঠেছে। আমার নিজের আসনেও তিনজন নারী আহত হয়েছেন। ৫৪টি জেলার রিপোর্ট আমরা জমা দিয়েছি।'
তিনি বলেন, '১১ দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে—সহিংসতা বন্ধ না হলে আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হব। তবে পার্লামেন্টে আমরা গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব। দেশ ও জাতির স্বার্থে কথা বলব। দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই। ১৬ই ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে প্রতিবাদসভা ও বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৩টায় কর্মসূচি হবে।'
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, 'শপথের বিষয়ে আমরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শপথ নেব, পার্লামেন্টে যাব, গঠনমূলক ভূমিকা রাখব। একইসঙ্গে রাজপথও আমাদের জন্য খোলা থাকবে।'
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি। পিআর সিস্টেম বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এসেছে। জনগণের ম্যান্ডেটের পর 'নোট অব ডিসেন্ট'-এর আর কার্যকারিতা নেই—এ মতও এসেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। একদল আসে, পাঁচ বছর পর আবার নির্বাচন হয়—এটাই স্বাভাবিক। তবে এবারের নির্বাচনে মানুষের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি—এ অভিযোগ রয়েছে।'
তারপরও আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, 'ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই। কমিশনকে বলেছি অভিযোগগুলো তদন্ত করুন। স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে সেটাই হবে বাংলাদেশের জন্য নতুন মাইলফলক।'
