ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সেরা ফল, কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির জোটসঙ্গী অন্য ইসলামী দলগুলোও ভালো সফলতা পেয়েছে এবারের নির্বাচনে। দীর্ঘদিন ধরে দলটি জোটের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হলেও এবারের নির্বাচনের ফলাফলে দেশের ক্ষমতার গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম একটি চ্যালেঞ্জিং, স্বতন্ত্র ভোটব্যাংকের উত্থান দেখা গেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে, তাদের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। আরও অর্ধশতাধিক আসনে অল্প ব্যবধানে পরাজয় ইঙ্গিত দিচ্ছে, দলটি এবার দেশজুড়ে স্বতন্ত্র ভোটভিত্তি গড়ে তুলেছে।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে জামায়াতের এই ফলাফলকে 'ভালো ফল' বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে একচেটিয়া জয় ও তাদের পক্ষে 'গণজোয়ারের' দাবির তুলনায় জাতীয় নির্বাচনের ভোটে ফল ভিন্ন এসেছে বলে দাবি করছেন কেউ কেউ। ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় সহিংসতা ও আধিপত্যবাদের বিপরীতে এদেশে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান হয়েছে।
'তবে এই উত্থানটা ইসলামাইজড নয়। জামায়াত জোটের অধিকাংশ দলই ধর্মীয় কট্টরতায় বিশ্বাসী। তবে মধ্যম পন্থার রাজনীতি এখানকার মূল শক্তি,' বলেন তিনি।
নতুন অনেক জায়গায় জয়
এবারের নির্বাচনে একঝাঁক নতুন মুখকে জিততে দেখা গেছে। প্রথমবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ অন্তত ৬০ জন।
স্বাধীনতার পর দলটি ঢাকায় কোনো আসন না পেলেও এবার শফিকুর রহমানসহ ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ৬টি জিতেছে জামায়াত। প্রথমবারের মতো আসন পেয়েছে গাজীপুর, ফরিদপুর, মাদারিপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও। অন্তত ১০টি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২ থেকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াতের এই উত্থানের জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী।
তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, 'আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাচন চালিয়েছে। সে কারণেই জামায়াত শক্তিশালী হতে পেরেছে।'
অনেক অঞ্চলে বিস্ময়কর ভালো ফল
দলটি সবচেয়ে ভালো করেছে খুলনা বিভাগে। বিভাগটিতে ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টি পেয়েছে জামায়াত। যদিও এই অঞ্চলেই দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার হেরেছেন।
রংপুর বিভাগ ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত হলেও এবার তা দখলে নিয়ে জামায়াত। রংপুর জেলায় ৬ আসনের সবকটিতে জয়লাভের পাশাপাশি বিভাগের ৩০ আসনের মধ্যে ১৬টিতে জিতেচে জামায়াত ও তাদের জোট।
বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত রাজশাহীতেও ভালো করেছে জামায়াত। প্রথমবারের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসঙই পেয়েছে দলটি। এছাড়া রাজশাহী জেলায় দুটিসহ নওগাঁ, সিরাজগঞ্জে আসন পেয়েছে তারা।
তবে চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে বরাবরের মতোই খারাপ করেছে দলটি। তবে এসব বিভাগের বেশ কিছু আসনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট এসেছে দলটির ঝুলিতে।
অনিয়মের অভিযোগ
তবে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব যোবায়ের বলেন, 'প্রকৃত অর্থেই জামায়াত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল। ভোটের দিন জাল ভোট দেওয়া, কেন্দ্র দখলসহ নানা কৌশলে জামায়াতকে কোণঠাসা করা হয়েছে। বেশ কিছু আসনে ভোট গণনায় কারচুপি করা হয়েছে।'
৬৮ আসন পাওয়ার পথে জামায়াতের যাত্রা
জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১৯৭৯ সালে। তবে সে সময় তারা সরাসরি নিজস্ব নামে নয়, বরং ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামক একটি নির্বাচনি মোর্চার অধীনে অংশ নিয়েছিল। ওই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা ৬টি আসনে জয়লাভ করেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিয়ে ১৮টি আসন পায় এবং সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দেয়।
১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করে ৩টি আসন পায় জামায়াত।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচননে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের শরিক হিসেবে নির্বাচন করে ১৭টি আসন পায় জামায়াত।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারো চার দলীয় জোটের হয়ে নির্বাচন করে ২টি আসন পায় তারা।
২০১৩ সালে উচ্চ আদালত জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করায় তারা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
২০২৫ সালে নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার পর সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে দলটি।
উত্থান কেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুবুল আলম মনে করেন, জামায়াতের এই উত্থানের প্রধান কারণ তিনটি। ২০১০ সালের পর সাংগঠনিক সংকট কাটিয়ে দলটি তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কাঠামোগত পুনর্গঠন করে। নতুন নেতৃত্বের উত্থান ও শৃঙ্খলাভিত্তিক সংগঠন তাদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রাখে। তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা ও ছাত্রসংগঠনের নেটওয়ার্ক কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া জোট রাজনীতিতে কৌশলী আসন বণ্টন ও সম্ভাবনাময় এলাকায় প্রার্থী মনোনয়ন তাদের ফল বাড়িয়েছে।
এছাড়া গ্রামীণ ও উপশহর এলাকায় দীর্ঘদিনের সামাজিক ও দাতব্য কার্যক্রমভিত্তিক নেটওয়ার্ক নির্বাচনে ভোটার সংযোগ জোরদার করেছে। সব মিলিয়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত অবস্থানই এবারের সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান মনে করেন, জামায়াতের ভোটের হার বৃদ্ধি মূলত বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার সাথে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনকে যদি ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে জামায়াতের মূল ভোট ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। 'এবার এটি ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।'
'যদি বিএনপি কার্যকরভাবে শাসন করতে না পারে, তাহলে আগামী বছরগুলোতে জামায়াত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাদের ভোটার সংখ্যা বাড়বে,' বলেন তিনি।
নির্বাচনী সাফল্য সত্ত্বেও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে জামায়াত এখনও উল্লেখযোগ্য বাধার সম্মুখীন। ১৯৭১ সালে তাদের বিতর্কিত ভূমিকা একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, এবং দলটিকে এখন একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক জোটের মধ্যে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার সাথে তার কট্টরপন্থী শিকড়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
