নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে এসেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা ক্রমেই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। তার সঙ্গে সঙ্গে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি কৌশল সাজানোতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা ও সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা।
গত তিনটি প্রায় একতরফা নির্বাচনের পর এবারের নির্বাচন আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এখন ভোটারদের কাছে পৌঁছানো, বার্তা প্রদান ও ডিজিটাল সম্পৃক্ততা বাড়াতে পেশাদারদের সহায়তা নিচ্ছেন।
ফলে প্রতিষ্ঠিত ও নতুন গড়ে ওঠা উভয় ধরনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানেই নির্বাচন-সংক্রান্ত সেবার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
বাংলাদেশে এখনো শুধু রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলেও বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করা বড় ও মাঝারি মানের বেশ কিছু এজেন্সি এখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে কৌশলগত পরামর্শ দিচ্ছে।
প্রার্থীদের নির্বাচনি কৌশল ও কনটেন্ট তৈরির কাজে সহায়তা দিচ্ছে উইনেক্স কনসাল্টিং। সরাসরি রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করার পরিবর্তে এই নির্বাচনে প্রার্থী-ভিত্তিক কাজে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
উইনেক্স যেসব সেবা দেয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বক্তৃতা লিখে দেওয়া, সমস্যা সমাধানের কাঠামো প্রদান, ভোটারদের সঙ্গে আবেগীয় সংযোগ এবং সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মিডিয়া-সংক্রান্ত সচেতনতামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান।
উইনেক্স কনসাল্টিং লিমিটেডের সিইও মোহাম্মদ জাকারিয়া টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশ যখন আরও গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই কৌশলগত প্রচারণা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, 'দেশ ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক সুসংহতকরণের দিকে এগোলে বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের হার বাড়বে। তখন অনলাইন ও অফলাইন প্রচারণার মাধ্যমে সুচারুভাবে ভোটারদের আস্থা জয় করা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। প্রচারণা যত সুসংগঠিত হবে, জয়ের সম্ভাবনা তত বাড়বে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এটা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত।'
জাকারিয়া আরও বলেন, তথ্য-উপাত্তনির্ভর ও সাংস্কৃতিক সংগতি বজায় রাখা এই পরামর্শক সেবা ভবিষ্যতে নিয়মিত নির্বাচন হওয়া প্রতিবেশী দেশগুলোতেও রপ্তানি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, 'বিশ্বজুড়ে এটা নতুন কিছু নয়। শক্তিশালী গণতন্ত্র থাকা দেশগুলোতে পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনি কৌশল প্রণয়নে বড় ভূমিকা পালন করে।'
ডিজিটাল প্রচারণায় ঝুঁকছে দলগুলো
এবারের নির্বাচনে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শেষ হবে।
৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির শেষ নির্বাচনি জনসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি ভাষণ দেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ উপকমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনজুর কাদের টিবিএসকে জানান, দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারণার প্রস্তুতি চলছে।
তিনি বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রেই দলীয়ভাবে এবং প্রার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে প্রচার-প্রচারণা, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন, জরিপ ও কৌশল প্রণয়নে সহায়তার জন্য ইলেকশন সাপোর্ট টিম নিয়োগ করেছেন। এসব প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।'
আইটি ও মিডিয়া ক্ষেত্রে পেশাদারদের সহায়তা নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মিডিয়া টিমের সদস্যরা জানান, সাংগঠনিক প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মের জন্য ভিডিও ডকুমেন্টারি ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির কাজে পেশাদার সংস্থাকে নিয়োজিত করা হয়েছে।
তারা আরও বলেন, প্রার্থীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্বাচনি গান, পোস্টার ডিজাইন, তথ্যচিত্র, প্রচারমূলক ভিডিও ও নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক নীতিমালা-সংক্রান্ত গবেষণাপত্র তৈরির জন্য আলাদাভাবে বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়োগ দিচ্ছেন। যদিও দলীয়ভাবে এসব কাজে কেন্দ্রীয় কোনো তহবিল দেওয়া হচ্ছে না। অধিকাংশ প্রার্থী নিজেই এই খরচ বহন করছেন।
তবে জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, তাদের অনলাইন প্রচারণার—বিশেষ করে ফেসবুকের—একটি বড় অংশ স্বেচ্ছাসেবী ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
'তাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই তারা জামায়াতের প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে এটা পেশাদার সংস্থাগুলোর চেয়েও বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে,' বলেন তিনি।
তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় জামায়াত 'জনতার ইশতেহার' নামক একটি প্ল্যাটফর্মও চালু করেছে, যার লক্ষ্য সরাসরি জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহবুবুল আলম টিবিএসকে বলেন, তার দল বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় থিম সং উন্মোচন করেছে এবং নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে।
আলম জানান, পুরো দলের নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া না হলেও প্রার্থীরা তাদের প্রচারণা পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কনটেন্ট ক্রিয়েশন টিম ও সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেছেন।
বিজ্ঞাপনী সংস্থার আদলে নির্বাচনি প্রচারণা
বর্তমান সময়ের নির্বাচনি প্রচারণা ক্রমেই বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং বা পণ্যের বিপণন কৌশলের আদল নিচ্ছে। এটি মূলত ভোটারদের নিয়ে গবেষণা, বার্তার বিন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ ও বহুমুখী যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে কোয়ান্টাম কনজ্যুমার সলিউশনস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তা নিয়ে গবেষণা করে। অন্যদিকে এশিয়াটিক ইভেন্টস, গ্রে ও বিটপি-র মতো সংস্থাগুলো প্রিন্ট, ডিজিটাল ও টেলিভিশন মিডিয়ায় ভিজ্যুয়াল ও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের কাজ করে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই এজেন্সিগুলোর অনেকেই এখন নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের একই ধরনের কৌশলগত সেবা দিচ্ছে।
বাণিজ্যিক অঙ্গনে ইউনিলিভার বাংলাদেশ, ম্যারিকো, ডাবর, গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এই এজেন্সিগুলোর প্রধান গ্রাহক। এর বিপরীতে রাজনৈতিক প্রচারণা এখনো তুলনামূলক নতুন কিন্তু দ্রুত বর্ধনশীল বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি টিবিএসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান নির্বাচনের 'যোগাযোগ-নিবিড়' বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভোটারদের তথ্য অনুসন্ধান, কর্তৃপক্ষের লজিস্টিক সমন্বয় ও গণমাধ্যমের সরাসরি সংবাদ প্রচারের কারণে ভয়েস কল, ডেটা ও মেসেজিং সেবার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
তিনি লিখেছেন, যেকোনো দেশের জন্য নির্বাচন হলো অন্যতম বৃহৎ যোগাযোগ-কেন্দ্রিক আয়োজন। ডিজিটাল অবকাঠামো কীভাবে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মূলভিত্তি হয়ে উঠেছে, তার লেখায় সেটিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
