নির্বাচনের বাকি এক সপ্তাহ; এখনও উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ বাকি থাকলেও উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের আয় ও সম্পদ বিবরণী এখনও প্রকাশ করেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যদিও সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ২৫ অগাস্ট সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেসে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধান মুহাম্মাদ ইউনূস বলেছিলেন, 'বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। আমাদের সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন।' প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণার পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ 'অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪' জারি করে।
নীতিমালা জারির ১৬ মাস পার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হয়নি। এরমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা, সমমর্যাদাসম্পন্ন অন্যান্য ব্যক্তি এবং তাদের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। কয়েকজন পর্যবেক্ষক টিবিএসকে বলেন, আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশ না করে সরকার স্বচ্ছতার চর্চা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নিজের স্বচ্ছতার চর্চা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
'প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে এই উদ্যোগের কথা বলেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে জনমনে সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে সেই আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটি প্রকাশ পেয়েছিলো। ফলে মেয়াদের শেষে এসেও এই তথ্য প্রকাশ না করা সরকারের জন্য বিব্রতকর। অন্যদিকে এই ঘটনা জনমনে প্রশ্নেরও উদ্রেক করেছে,' বলেন তিনি।
টিআইবি-প্রধান বলেন, এই সরকার যদি উপদেষ্টা ও সমমর্যাদার ব্যক্তিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করত, তাহলে পরবর্তীতে যে সরকার আসবে, তাদের জন্য তথ্য প্রকাশ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হওয়ায় পরবর্তী সরকার যুক্তি বা উদাহরণ দেখাতে পারবে। এরমধ্য দিয়ে অস্বচ্ছতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেল।
কয়েকজন উপদেষ্টা টিবিএসকে বলেন, তারা গত দুই অর্থবছরের জন্য যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন, সেই তথ্য রিটার্ন দাখিলের পরপরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। একইসাথে তাদের স্বামী/স্ত্রীদের সম্পদের তথ্যও মন্ত্রিপরিষদ বিভোগে জমা দিয়েছেন।
খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বুধবার টিবিএসকে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দুটি অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন দাখিল করে সেই তথ্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। তবে সরকার এসব তথ্য প্রকাশ করবে কি না, সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে গত ২৬ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার তথ্য তার ফেসবুকে পেজে এক স্টাটাসের মাধ্যমে জানান। তিনি লেখেন, ২০২৪-এর নীতিমালা অনুসারে, নিজের ও তার স্ত্রীর আয় ও সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন। আর আগেই আয়কর রিটার্নের সাথে এগুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে।
পরে উপদেষ্টা টিবিএসকে বলেন, তিনি যতদূর জানেন, অন্যান্য অনেক উপদেষ্টাও তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন।
আরেকজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি তার সম্পদের হিসাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে জমা দিয়েছেন। আর তার সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করার কোনো কারণ তিনি দেখেন না।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলে আসছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যপক দুর্নীতি হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার বিভিন্ন সময়ের ভাষণে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকার এই অনিয়ম দুর্নীতির অবসান ঘটাতেই দায়িত্ব নিয়েছে।
তবে গত দেড় বছরে একাধিক উপদেষ্টা ও তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতির অভিযোগ
২০২৫ সালের আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় ঘটা চাঁদাবাজির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ারও জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তবে আসিফ মাহমুদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে' চাঁদাবাজির ঘটনায় তার নাম জড়ানো হয়েছে।
এছাড়া আসিফ মাহমুদের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পৃথক অভিযোগ ওঠে।
প্রাথমিক তদন্তের পর দুজনকেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়। মোয়াজ্জেম হোসেনের বিদেশে যাওয়া ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
একইভাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধেও বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তিনি সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামেরও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করার কথা জানানো হলেও গত দশ মাসে সেটার কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠার পর গত বছর আসিফ মাহমুদ বলেছিলেন, পদত্যাগ করার আগে তিনি নিজেই সম্পদের তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সেটি করেননি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উপদেষ্টারা যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন তাদের কী পরিমাণ সম্পদ ছিল, সেটি জনগণ জানেন না। ফলে এখন যদি তা প্রকাশ করাও হয়, তাহলে দায়িত্বকালীন সময়ে সম্পদের তুলনায় গত দেড় বছরে কী পরিবর্তন হয়েছে, তা পরিস্কার করা উচিত।
গত বছরের আগস্টে মাসে ঢাকায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে 'সীমাহীন দুর্নীতির' অভিযোগ তোলেন সাবেক সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ আছে তার কাছে। এবিএম সাত্তার বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের একান্ত সচিব পদে কর্মরত ছিলেন। তবে সাত্তারের এই বক্তব্যের পরে সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ 'ভিত্তিহীন' বলে খারিজ করে দেওয়া হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের পরপরই ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বা সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেল।
