অদক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ, ভোট গণনায় সময়ক্ষেপণ, ভোটার মাইগ্রেশন নিয়ে উদ্বেগ বিশিষ্ট নাগরিকদের
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ও অদক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষক নিয়োগ, ভোট গণনায় ধীরগতি, এক আসন থেকে অন্য আসনে ভোটার স্থানান্তর এবং ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে হলে ব্যালট পেপার রাতে কেন্দ্রে না পাঠিয়ে ভোটের দিন সকালে পাঠানো এবং ভোটকেন্দ্রের ভেতরের 'অদৃশ্য কারচুপি' রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার ভবনে বাংলাদেশ রিসার্চ এনালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন) আয়োজিত 'ভোট কারচুপি রোধে নাগরিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ'- শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অজ্ঞাত ও অদক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়ে শঙ্কা মূল প্রবন্ধে ড. শফিকুর রহমান বলেন, 'নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন স্থানীয় পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছেন, যার মধ্যে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রায় ৩১ হাজার ৮০১ জন (৬৮.৮৯%) পর্যবেক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট (পাশা) একাই ১০ হাজার ২৩৫ জন পর্যবেক্ষকের অনুমোদন পেয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের এত বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক দেওয়ার সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে মাত্র ২০-৩০ হাজার ভোট গণনা করতে একদিনের বেশি সময় লেগেছে। জাতীয় নির্বাচনে এমন ধীরগতি হলে তা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সন্দেহের সৃষ্টি করবে।'
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, 'নির্বাচনে কারচুপি দুই ধরনের হয়—দৃশ্যমান ও অদৃশ্য। তফসিল ঘোষণার আগেই সীমানা নির্ধারণ ও ভোটার স্থানান্তরের মাধ্যমে কারচুপির নকশা করা হয়।'
ভোট গণনার বিষয়ে তিনি বলেন, 'প্রিজাইডিং অফিসাররা অনেক সময় কেন্দ্রে এক ফলাফল ঘোষণা করেন এবং রিটার্নিং অফিসারের কাছে গিয়ে আরেক ফলাফল জমা দেন। রিকাউন্টিং বা পুনর্গণনার ব্যবস্থা না থাকলে এই জালিয়াতি ধরা প্রায় অসম্ভব।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রুমানা পারভীন রাতে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে পাঠানোর তীব্র বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, 'রাতের অন্ধকারে ব্যালট পেপার স্থানান্তরের কোনো যুক্তি নেই। এতে কারচুপির সুযোগ তৈরি হয়। জাতীয় নির্বাচনে অবশ্যই ভোটের দিন সকালে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'নেকাব পরা নারী ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই পরিচয় নিশ্চিত করতে নারী পোলিং অফিসারদের মাধ্যমে মুখমণ্ডল যাচাই করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।'
অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, 'নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের জবাবদিহি জনগণের কাছে। অতীতে আমরা দেখেছি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ছিল। কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সব ধরনের প্রভাবমুক্ত।'
তিনি আরও বলেন, 'জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা অপতথ্য ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন পরাজিত শক্তি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে জনগণ সজাগ থাকলে কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না।'
লক্ষ্মীপুরে ভোটের সিল উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, 'আমার কাছে আরও ভয়ের যেই অনুভূতিটা তৈরি হয়েছে, তাহলে কি তারা ব্যালট পেপারের সফট কপিটাও আগেই কোনোভাবে পেয়েছেন? কারণ তা না হলে ভোট দেয়ার সিলটা কেন পাওয়া যাবে?'
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট তুহিন খান নির্বাচনকালীন মোজো (মোবাইল জার্নালিজম) সাংবাদিকদের অপব্যবহার নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, 'কিছু প্রার্থী শত শত মোজো সাংবাদিক নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে দেখানোর চেষ্টা করে, যা এক ধরণের ম্যানিপুলেশন। নির্বাচন কমিশনকে মিডিয়ার দায়িত্ব ও ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা করতে হবে।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহরিন ইসলাম খানের সঞ্চালনায় গোলটেবিল সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়।
