ভোট কারচুপি ঠেকাতে প্রতিটি কেন্দ্রে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে বিএনপি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু করতে, কারচুপি ঠেকাতে এবং ন্যায্যভাবে দলীয় বিজয় নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী নিয়োগের নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।
দলটি যেসব ভোটকেন্দ্রকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক নেতা-কর্মী সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় মনিটরিং আরও জোরদার করা হয়েছে। ভোটারদের প্রভাবিত করা, ভোটে বাধা দেওয়া কিংবা ফলাফল প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় সূত্র জানায়, তফসিল ঘোষণার আগেই প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১১০ সদস্যের একটি নির্বাচনী কমিটি গঠন করা হয়েছে। মূলত এই কমিটির সদস্যরাই ভোটের দিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অতিরিক্ত নেতা-কর্মী মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আইন সহায়তা উপ-কমিটির টিম লিডার এবং দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠভাবে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ভোটের দিন তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে কেন্দ্রে অবস্থান নেবেন।"
তিনি বলেন, "এই ঘোষণার উদ্দেশ্য একটাই—ভোট যেন সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়। দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব হলো ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়া, যাতে কেউ কোনোভাবেই ভোটে প্রভাব খাটাতে না পারে।"
তিনি আরও বলেন, আইন মেনে ভোটকেন্দ্রের নিকটবর্তী বিএনপির বুথে নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেবেন। তারা ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ শান্ত ও সুষ্ঠু রাখা এবং নির্বাচনী উৎসব বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো অবৈধ শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা হলে সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত অবহিত করা হবে এবং আইন মেনে যতটা সম্ভব অবৈধ প্রভাব প্রতিরোধে কাজ করা হবে।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও বগুড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি মীর শাহে আলম টিবিএসকে বলেন, "ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এবং সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের পরিবেশ তৈরিতে আমরা প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কমিটিগুলোকে সক্রিয় করেছি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে যেকোনো অপশক্তি মোকাবিলায় দলের সব স্তরের নেতা-কর্মীরা ভোটের দিন পুরো সময় এবং ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কেন্দ্রে কাজ করবেন।"
তিনি বলেন, "প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কমিটির নেতা-কর্মীরাই হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে পরিচালনা করবেন। আমার এলাকায় প্রতিটি কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী পুরো সময় নিয়োজিত থাকবে। আর যেসব কেন্দ্রকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি, সেখানে থানা পর্যায়ের নেতারা সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন।"
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী টিবিএসকে বলেন, "ভোটে কারচুপির চেষ্টা করতে পারে—এমন কুচক্রী মহল তৎপর থাকতেই পারে। যেসব এলাকাকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি, সেগুলোর তথ্য নির্বাচন কমিশনকে জানানো হচ্ছে। আমরা নিয়মিত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছি। এখন শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেটাই দেখার বিষয়।"
তিনি বলেন, "ক্ষমতাশালী কোনো মহলের গোপন নীলনকশা থাকলে তা সাধারণ মানুষের বুঝতে সময় লাগতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশনকে আন্তরিক মনে হচ্ছে। তাদের ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে। আমরা আশা করি, তারা সেই আস্থা রক্ষা করবে এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না।"
রিজভী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলোতে দলীয়ভাবে আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় নয়। কোনো জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হবে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হলে বা ভীতি সৃষ্টি করা হলে সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হবে।
"আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা আমরা নিতে পারি না, আইন হাতে তুলে নিতে পারি না। আমরা শুধু নিশ্চিত করতে চাই, আমাদের দলের নেতাকর্মীরা, সমর্থকরা যেন নির্ভয়ে ও নিঃসংকোচে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন," বলেন তিনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, "ইতোমধ্যে একটি রাজনৈতিক জোট বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোট কারচুপি, অবৈধ ব্যালট দিয়ে ভোট এবং কেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা করেছে। এসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে দলের পক্ষ থেকে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা এসব কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবেন।"
রাজধানীর কয়েকটি আসনকে বিএনপি চ্যালেঞ্জিং মনে করছে বলে জানান ওই নেতা। তিনি বলেন, "১১-দলীয় জোটের একটি দলের মূখ্য সমন্বয়ক যে এলাকায় নির্বাচন করছেন, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠন বাইরে থেকে কর্মী এনে বিভিন্ন অপতৎপরতার মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করার পরিকল্পনা করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "ওই আসনে বিএনপির সব স্তরের নেতা-কর্মীরা ভোটের দিন ফজরের নামাজের পর থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত অবস্থান নিয়ে যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিহত করবেন।"
ঢাকা-১১ আসনে ১১-দলীয় জোটের একটি দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুম। ওই আসনে ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন শীর্ষ নেতা টিবিএসকে বলেন, "আমরা কিছুটা আশঙ্কায় আছি। তাই কেন্দ্রভেদে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত নেতা-কর্মী চিহ্নিত ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করবেন। কোনোভাবেই অবৈধ শক্তির প্রদর্শন বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হবে না।"
এর আগে ময়মনসিংহে এক জনসভায় ভোটের দিন সবাইকে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেন, "ভোটকেন্দ্র পাহারা দিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।"
তিনি বলেন, "ফজরের নামাজ আদায় করে ভোট দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসলেই হবে না, ভোটকেন্দ্রে থাকতে হবে।"
তার বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বহু বছর ধরে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। অতীতে ভোট লুটের ঘটনা ঘটেছে দাবি করে তিনি বলেন, "সবাইকে সজাগ থাকতে হবে, যাতে কেউ ভোট লুট করতে না পারে।"
একই সঙ্গে আরেকটি নির্বাচনী সভায় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভুয়া ব্যালট ছাপানোর অভিযোগও তোলেন তিনি।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার সারাদেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ থাকবে এবং মোট ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি। প্রতিটি কেন্দ্রেই বিএনপির নেতা-কর্মীরা শক্ত অবস্থানে থাকবেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
