সেবা ও সক্ষমতার ঘাটতির মধ্যেও ঢাকার বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা বাড়ছে
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী চলাচল বেড়েই চলেছে। তবে অবকাঠামোর চাপ, সেবার ঘাটতি ও উচ্চ বিমানভাড়ার কারণে একই সঙ্গে যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী। এর আগের বছর ২০২৪ সালে যাত্রী সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ১ কোটি ১৭ লাখ। এক বছরে যাত্রী বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার, যা প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ। মূলত আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল বাড়ার কারণেই এই বৃদ্ধি ঘটেছে। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩০ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন।
গত বছর মোট যাত্রীর মধ্যে অন্তত ১ কোটি ৩১ হাজার ২০০ জন আন্তর্জাতিক রুটে এবং ২৪ লাখ ১১ হাজার জন অভ্যন্তরীণ রুটে ভ্রমণ করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়, বিমানবন্দরটি বিদেশগামী যাত্রীদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
তবে ধারাবাহিক এই যাত্রী বৃদ্ধি বিমানবন্দরের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকেও আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী সামলানোর জন্য নকশা করা এই বিমানবন্দর এখন প্রায় দ্বিগুণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, যাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিমানবন্দরের কার্যক্রমে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে পিক ট্রাভেল সিজন বা ভ্রমণের মৌসুমে।
এদিকে, বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বিমানবন্দরের বহুল প্রত্যাশিত তৃতীয় টার্মিনালটি এখনো চালু হয়নি। অপারেটর নিয়োগ নিয়ে জটিলতা না কাটায় প্রকল্পটি এখন অচল অবস্থায় রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে ২ কোটির বেশি যাত্রী সামলানো সম্ভব হবে এবং যাত্রী চলাচল ও সেবার মানে বড় ধরনের উন্নতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ততদিন পর্যন্ত ভিড় ও জটের ভোগান্তি থেকে রেহাই মিলছে না যাত্রীদের।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ভিআইপি সেবার ঘোষণা দেন। বাস্তবে এর আওতায় এখন পর্যন্ত দুটি লাউঞ্জ খোলা হয়েছে। এর একটি টার্মিনালের ভেতরে, যেখানে বিশ্রামের ব্যবস্থা ও ভর্তুকি মূল্যে খাবার দেওয়া হয়। আর অন্যটি রয়েছে বহুতল গাড়ি পার্কিং ভবনে।
অগ্রগতি
এতসব সমস্যার মধ্যেও বিমানবন্দরে বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ)-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি কিছুটা কমেছে। এ উন্নতির পেছনে সার্বক্ষণিক ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি, অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন চালু এবং লাগেজ বহনকারীদের জন্য বডি ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, "এই উদ্যোগগুলো বিশেষ করে যাত্রী চলাচল ও লাগেজ সংগ্রহে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।"
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "প্রবাসী শ্রমিকদের যাতায়াত ব্যয় কমানো এবং তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু নিশ্চিত করা এখনো প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়। এক্ষেত্রে আরও অনেক কাজ বাকি।"
এদিকে, এ বিষয়ে জানতে বেসামরিক বিমান চলাচল উপদেষ্টা এস কে বশির উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পায়নি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ বলেন, বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্যেই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি জট ও ট্রলি সংকটের মতো সমস্যাকে সাময়িক বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বর্তমান অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিমানভাড়া এখনো চড়া
এদিকে, টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার নির্দেশনা দিলেও বিমানভাড়া এখনো অনেক বেশি। ট্রাভেল এজেন্টদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে টিকিটের দাম ৩৫–৪০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন ৭৫–৮০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট মাহমুদুল হক পিয়ারু বলেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, "আসনসংকটই এখনো মূল সমস্যা। আন্তর্জাতিক রুটের ৬৬ শতাংশ বাজার বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে থাকায় ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আনতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে শক্তিশালী করা জরুরি।"
আরেক ট্রাভেল এজেন্ট দিদারুল হক বলেন, "ব্লক ও গ্রুপ টিকিটে কড়াকড়ির কারণে কিছু অনিয়ম কমেছে। তবে আসনসংকটের মূল সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি।
ভিড় ও বিশৃঙ্খলা
বিমানবন্দরের ভোগান্তি অনেক সময় টার্মিনালে ঢোকার আগে থেকেই শুরু হয়। বিমানবন্দরের প্রবেশপথে দীর্ঘ যানজট এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র যানজটের কারণে অনেক সময় বহির্গামী যাত্রীরা চেক-ইনের সময়সীমাও মিস করছেন।
অনেক যাত্রী আবার দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ডের ঘাটতির অভিযোগও করছেন। এতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরতে গিয়ে কেউ কেউ ভুল করে আগমন বা অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে ঢুকে পড়ছেন; এতে করে যানজট ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রবেশপথ ও ক্যানোপি এলাকায় কড়া নিরাপত্তা তল্লাশির কারণেই যানজট বেশি হচ্ছে। পাশাপাশি হজ ক্যাম্পের কাছে আন্ডারপাস নির্মাণের কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলায় এ সমস্যা আরও বেড়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এ প্রকল্প শেষ হতে আরও অন্তত এক বছর লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগিব সামাদ বলেন, ড্রাইভওয়ে ও ক্যানোপি এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর তল্লাশি 'অত্যন্ত জরুরি'।
ট্রলি সংকট ও ফ্লাইট বিঘ্ন
টার্মিনালের ভেতরে যাত্রীদের নিয়মিত ভোগান্তির একটি কারণ হলো ট্রলির সংকট, বিশেষ করে শীতকালে। আন্তর্জাতিক যাত্রীরা জানিয়েছেন, লাগেজ নেওয়ার জন্য অনেক সময় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ট্রলি পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ট্রলির প্রকৃত সংকটের কথা মানতে নারাজ। তাদের ব্যাখ্যা, শীতকালের কুয়াশার কারণে ফ্লাইট সূচি ব্যাহত হওয়ায় ভোরে একসঙ্গে ১৩ থেকে ১৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ করে। ঢাকার বিমানবন্দরে লাগেজ সংগ্রহের জন্য মাত্র আটটি বেল্ট রয়েছে, এতে তীব্র ভিড় তৈরি হয় এবং ট্রলি ঘুরে আসতে দেরি হয়।
এদিকে, গত ২৯ অক্টোবর রানওয়ের লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস)–এর মান কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে আইএলএস ক্যাটাগরি-১ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে ঢাকার বিমানবন্দর—যেখানে ফ্লাইট নামার জন্য অন্তত ১,২০০ মিটার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন। আগে ক্যাটাগরি-২-এর আওতায় ৫০০-৭৫০ মিটার দৃশ্যমানতাতেই ফ্লাইট নামতে পারতো।
ফলে শীতকালীন ঘন কুয়াশায় প্রায়ই ফ্লাইট বিলম্বিত হচ্ছে বা কলকাতা, সিলেট কিংবা চট্টগ্রামে ডাইভার্ট করতে হচ্ছে। আবহাওয়া উন্নত হলে এসব ফ্লাইট একসঙ্গে ঢাকায় ফিরে আসে, এতে টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
অচল ই-গেট
এদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে স্থাপিত ৪৪টি ই-গেট এখনো কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব ই-গেট স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জানান, ই-গেট ব্যবহার করলেও যাত্রীদের ভিসা যাচাইয়ের জন্য আবার হাতে-কলমে কাউন্টারে যেতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে।
জানা গেছে, সফটওয়্যার সমন্বয়জনিত সমস্যার কারণে অধিকাংশ ই-গেটই বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
