পায়ে হেঁটে, প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে: যেভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন চট্টগ্রামের ৪ নারী প্রার্থী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ জন, যা মোট প্রার্থীর সাড়ে তিন শতাংশেরও কম। অথচ এসব আসনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৮ শতাংশই নারী।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং–খুলশী–হালিশহর) আসনে দুই নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—বাসদ (মার্কসবাদী)-এর আসমা আক্তার ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের সাবিনা খাতুন। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর–পতেঙ্গা) আসনে বাসদ (মার্কসবাদী)-এর প্রার্থী দীপা মজুমদার এবং চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে একমাত্র স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জিন্নাত আকতার।
সীমিত সম্পদে পায়ে হেঁটে প্রচারণা
চট্টগ্রাম-১০ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী)-এর প্রার্থী আসমা আক্তার গত দশ দিন ধরে সীমিত সম্পদ ও অল্পসংখ্যক কর্মী নিয়ে পায়ে হেঁটে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বড় মিছিল, উচ্চস্বরে মাইকিং বা শোডাউনের বদলে তিনি সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলার পথ বেছে নিয়েছেন।
লিফলেট বিতরণ, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে পথচারীদের সঙ্গে আলাপ এবং ছোট পরিসরের রোডসাইড সভার মধ্য দিয়েই চলছে তার প্রচারণা। গতকাল (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নগরীর চৌমোহনিতে প্রচারণা চালান তিনি। সেখানে দোকানে দোকানে ঘুরে লিফলেট বিতরণ করেন।
"আমার কাছে বড় মিছিল করার মতো অর্থ বা কর্মী নেই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আসল রাজনীতি হলো সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলা," বলেন আসমা আক্তার।
গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে বাহাদ্দারহাট চৌমোহনিতে একটি ছোট রোডসাইড সভা করেন তিনি। সেখানে তার প্রচারণার সামগ্রী ছিল একটি হ্যান্ড মাইক, নাম ও প্রতীকসহ পোস্টার এবং লিফলেট। আসমার অভিযোগ, প্রত্যাশার তুলনায় উপস্থিতি ছিল কম। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ থেকে তার সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-১০ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৬ জন এবং ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৩৯টি। এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীও রয়েছেন।
আসমা আক্তার বলেন, পরিচিত বিএনপি, এনসিপি ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দলগুলোর বাইরে আরও অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে—এ বিষয়ে খুব কম মানুষই জানে।
তার অভিযোগ, গণমাধ্যম মূলত পরিচিত দলগুলোর সামান্য কার্যক্রমও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, কিন্তু ছোট দলের প্রার্থীদের কার্যক্রম তেমনভাবে উঠে আসে না।
"রাষ্ট্র চাইলে মানুষ আমাদের সম্পর্কে জানতে পারত। আমি ২৩ ডিসেম্বর থেকে মাঠে সক্রিয়, কিন্তু কোথাও আমার কাজের উল্লেখ নেই," বলেন তিনি।
তার ভাষায়, নারী প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক মাঠ আরও কঠিন। "মহিলাদের জন্য এই ব্যবস্থায় জায়গা খুব কম। তাই আমি মাঠে থেকে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলাটাকেই সবচেয়ে কার্যকর মনে করি।"
নারী প্রার্থীদের দ্বিগুণ লড়াই
চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী দীপা মজুমদার বলেন, সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে নারী প্রার্থীদের নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। একজন পুরুষ প্রার্থী রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত অনায়াসে প্রচারণা চালাতে পারলেও, নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তা অনেক সময় সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশনের সব নিয়ম মেনে চলার জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।"
দীপা মজুমদার বলেন, নামাজের সময় পুরুষরা প্রচারণা চালালে সেটি সাধারণত নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না। কিন্তু একজন নারী প্রার্থী হিসেবে দোকানে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বললে সেটিই নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
"আমি ব্যক্তিগতভাবে নামাজের সময়কে সম্মান করি। আজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষরা তা না মানলেও সেটি কোনো ইস্যু হয় না। এই বৈষম্যটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ," বলেন তিনি।
কটু কথা ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা
চট্টগ্রাম-১০ আসনের আরেক নারী প্রার্থী সাবিনা খাতুন বলেন, মানবিক দায়িত্বগুলোকে সামনে রেখে তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে একজন নারী হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে চলতে গিয়ে নানা ধরনের কটু কথা শুনতে হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও অসম্মানজনক আচরণের শিকার হতে হয় প্রায়ই, যা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
চট্টগ্রাম-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতারও বড় দলের বাইরে থেকেই ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
