পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থানসহ ৩৬ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা এনসিপির
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানিয়ে 'তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার' শীর্ষক নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলের লা ভিটা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ৩৬ দফার এই সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে ইশতেহারটি উন্মোচন করা হয়। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন দলের মুখপাত্র এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা এতে অংশ নেন।
১২টি অধ্যায় এবং ৮৬ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ রক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জবাবদিহিতা ও বিচার ব্যবস্থা
ইশতেহারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, 'জুলাই সনদের' যেসব বিধান আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য, তা তদারকির জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে। জুলাই গণহত্যা, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, বিডিআর বিদ্রোহ, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন' গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার রক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে একটি বিশেষ তদন্ত সেল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং জাতিগত নিপীড়নের স্বাধীন তদন্ত করার ক্ষমতা রাখবে।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা
এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের বিবরণ 'হিসাব দাও' নামক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। সিভিল সার্ভিস সংস্কারের ক্ষেত্রে ল্যাটারাল এন্ট্রি বৃদ্ধি, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পদোন্নতি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন স্কেল এবং জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এনসিপি প্রতি ঘণ্টায় ১০০ টাকা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। এছাড়া শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিমা ও পেনশন স্কিম চালু, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা কমানো এবং কর ফাঁকি রোধ করে কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। দলটি একটি ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ার অঙ্গীকার করেছে।
আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে এনসিপি। এসএমই, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ প্রবাহ-ভিত্তিক ঋণ এবং ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) টাকার একটি উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক ১৫ লাখ দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠানোর জন্য সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
শিক্ষা খাতে একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রবর্তন এবং পাঁচ বছরের মধ্যে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ৭৫ শতাংশ জাতীয়করণের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ বা থিসিস গবেষণা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি মেধা পাচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে 'স্পেশালাইজড হেলথকেয়ার জোন' স্থাপন, জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা চালু, জেলা হাসপাতালগুলোতে আধুনিক আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং এনআইডি-ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালু করা হবে।
নারী কল্যাণ ও ক্ষমতায়ন
নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নিম্নকক্ষে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ১০০টি সংরক্ষিত নারী আসনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা, সরকারি অফিসে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ বা ঋতুকালীন ছুটি প্রদান, কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা এবং নারীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর বিকেন্দ্রীকৃত বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিবেশ ও অবকাঠামো
দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করা, শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক করা এবং পাঁচ বছরের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি যানবাহনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক যানবাহন সংগ্রহে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এনসিপি জানিয়েছে, ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা সীমান্ত হত্যা এবং পানিবণ্টন সমস্যার মতো অমীমাংসিত বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনি পথ অনুসরণ করা হবে। রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক সমাধান এবং আসিয়ান সদস্যপদ লাভের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য প্রচলিত সশস্ত্র বাহিনীর দ্বিগুণ আকারের একটি রিজার্ভ ফোর্স গঠন, পাঁচ বছরের মধ্যে একটি ইউএভি বা ড্রোন ব্রিগেড স্থাপন এবং মধ্যম পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল সিস্টেম সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এনসিপি নেতারা জানান, এই ইশতেহার মূলত তারুণ্য-নির্ভর, জবাবদিহিমূলক এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
