অভ্যুত্থানের পর নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ধারণাটি ছাত্র-জনতার কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি: মাহফুজ আলম
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী কাঙ্ক্ষিত নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ধারণাটি জনগণের কাছে, বিশেষ করে ছাত্র-জনতার কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের যে 'ক্ষমতার ত্রিভুজ' (ট্রায়াড অব পাওয়ার), তা ভাঙতে সরকার ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত 'পুরাতন বন্দোবস্তে ভাঙন, সংস্কার এবং গণতন্ত্রের পুনর্ভাবনা' শীর্ষক একটি সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের বিগত ১৫ মাসের কর্মকাণ্ড ও অভিজ্ঞতার নির্মোহ মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেছেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন, '৫ই আগস্টের পর আমরা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বদল এবং হাসিনার পতনের বাইরেও রাষ্ট্রের একটি বড় রদবদলের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিষয়টি আমাদের অডিয়েন্স বা অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির কাছে স্পষ্ট করা যায়নি।'
রাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি 'ট্রায়াড অব পাওয়ার' বা ক্ষমতার ত্রিভুজের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির জায়গায় আমরা ভয়াবহভাবে ফেইল (ব্যর্থ) করেছি। এই আমলাতন্ত্র এখনো এক্সিস্ট করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এখানেই সবকিছু আটকে গেছে।'
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা তুলে ধরে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, 'সরকার ইকোনমিটাকে জাস্ট ঠেক দিয়ে রেখেছে। এটি যেকোনো দিন পড়ে যেতে পারে। আগের চেয়ে হয়তো কিছুটা স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা এসেছে, কিন্তু ভূমি সংস্কার বা সম্পদ বণ্টনের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো গত ৩০-৫০ বছরেও কেউ সামনে আনেনি।'
রাজনৈতিক মীমাংসা বা রিকনসিলিয়েশন প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন, 'অভ্যুত্থানের পর আমরা চেয়েছিলাম একটি 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন' প্রক্রিয়া।'
ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রতিহিংসার সংস্কৃতি নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, 'জামায়াতকে যেভাবে নাশ করা হয়েছিল অতীতে, সেভাবে আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার সংস্কৃতি চালু রাখলে তা ভবিষ্যতে এখনকার মতোই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা চাই না আরেকটা দৈত্য তৈরি হোক। কেননা সে দৈত্যকে মারার জন্য অনেকগুলো নিপীড়নমূলক আইন তৈরি করতে হবে এতে রাষ্ট্র আরো বেশি দমনমূলক হয়ে পড়বে।'
মানবাধিকার প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন, 'আমরা চেয়েছিলাম হত্যা ও গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে। তারপরও গত এক-দেড় বছরে অনেকগুলো জিনিস হয়েছে।'
আলোচনায় সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি। মাহফুজ আলম বলেন, 'বিগত ১৫ বছরে সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগকে বৈধতা দিতে গিয়ে এখন নিজেরাই পঙ্গু হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল এবং সিভিল সোসাইটির কাজের ক্ষেত্র আলাদা হওয়া উচিত।'
তবে সরকারের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তরুণ প্রজন্মের ওপর আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমাদের প্রজন্মের মধ্যে যে যন্ত্রণা ও ট্রমা আছে, তা থেকেই তারা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। সরকার ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়নি। আমাদের সামনে ভুল থেকে শেখার এবং কোর্স কারেকশনের দীর্ঘ সময় পড়ে আছে।'
