আপনার একটি ভোট শুধু সরকার নির্বাচন করবে না, ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে: প্রধান উপদেষ্টা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ১৩তম সাধারণ নির্বাচন এবং 'জুলাই জাতীয় সনদ' বিষয়ে প্রস্তাবিত গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে।
আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশবাসীকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি, জুলাই সনদের গুরুত্ব এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণে জনগণের ভূমিকার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তার ভাষণের পূর্ণ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
ভাষণের শুরুতেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীকে অভিবাদন জানিয়ে বলেন, 'আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সাথে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। এটি সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।'
তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করেন এবং বলেন, 'আপামর জনগণের—বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের—আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন ও গণভোট সম্ভব হতো না।'
এবারের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় শান্তিপূর্ণ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, 'মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে। এজন্য আমি সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই।'
তবে প্রচারকালীন সময়ে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন।
রেকর্ডসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ
প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। স্বতন্ত্রসহ প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। তিনি বলেন, 'এই নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়, এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। রাজপথের দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে।'
নারী ও তরুণ ভোটারদের প্রতি বিশেষ বার্তা
গত ১৭ বছর ধরে যারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, সেই তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, 'আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল কিন্তু ভোট ছিল না। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর দিন এসেছে।'
তিনি বলেন, 'ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনদিন হারাতে দেবে না।'
নিরাপত্তায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো সারাদেশে সিসি ক্যামেরা, কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা, ড্রোন এবং ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রবাসী ও কারাবন্দিদের ভোটাধিকার
গণতন্ত্রের পরিধি বিস্তৃত করতে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং আইনি হেফাজতে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট
জুলাই জাতীয় সনদ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, 'এটি কোনো দলের একক ইশতেহার নয়। ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই সনদ প্রস্তুত করেছে। এই গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে আমরা জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামো নিয়ে এগোতে চাই কি না। আপনাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর রাষ্ট্রব্যবস্থা।'
ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গুজব প্রসঙ্গে
বর্তমান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না—এমন অপপ্রচারকে ভিত্তিহীন দাবি করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, 'নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।'
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান
ভাষণের শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, 'দেশের চাবি এখন আপনাদের হাতে। সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।'
তিনি সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি নির্দেশ দেন যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। যেকোনো তথ্যের জন্য তিনি 'নির্বাচনবন্ধু হটলাইন—৩৩৩' ব্যবহার করার পরামর্শ দেন।
