যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে পাল্টা শুল্ক কমানোর ঘোষণা আসতে পারে আগামী সপ্তাহে: লুৎফে সিদ্দিকী
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকেই এ বিষয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম' (ডব্লিউইএফ)-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও এর ফলাফল নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে আন্তরিক এবং এ সপ্তাহের শেষে বা আগামী সপ্তাহের শুরুতে এ বিষয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে। তবে বর্তমানে থাকা ২০ শতাংশ শুল্ক ঠিক কতটা কমানো হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।'
তিনি জানান, দাভোস সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য স্কট বেসেন্টের সঙ্গে তার এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিশেষ দূত বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের নন-ট্যারিফ নীতির অনেক উপাদান বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে মিলে যায়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য বাধা কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক।'
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও জিএসপি প্লাস চ্যালেঞ্জ
ইইউ-এর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়ে লুৎফে সিদ্দিকী জানান, ইইউ কমিশনার রোক্সানা মিনজাতু এবং জোসেফ সিকেলার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইইউ এ বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও তাদের প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতির। তিনি সতর্ক করে বলেন, 'ইইউ বর্তমানে ভারতের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে কাজ করছে এবং এরপর ভিয়েতনামের দিকে নজর দিতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।'
তিনি আরও বলেন, 'এলডিসি থেকে উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া সহজ হবে না। বিশেষ করে রপ্তানি যদি কেবল একটি পণ্যের (তৈরি পোশাক) ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে এই সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থাকে। আগামী সরকারের জন্য তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত নোট রেখে যাবেন বলে জানান।'
জাপানের সঙ্গে চুক্তি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পরামর্শ
জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিওসি। এছাড়া এলডিসি উত্তরণের পরও তিন বছর জাপানে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
এদিকে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির (এফটিএ বা ইপিএ) ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও অবৈধ অভিবাসন
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, 'মিয়ানমারকে ঘিরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বাংলাদেশকে তার ন্যায্য দাবিতে অনড় থাকতে হবে।'
অভিবাসন নিয়ে তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক মহলে একটি ধারণা আছে যে বাংলাদেশ অবৈধ অভিবাসন নিয়ে ততটা সিরিয়াস নয়। এই ধারণা পরিবর্তনের কাজ চলছে। গত মাসে সিঙ্গাপুর থেকে ৬০০ জন জাল পাসপোর্টধারীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এবার তাদের বিরুদ্ধে সিআইডির মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'
বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, 'শুধু সমঝোতা স্মারক সই, করমর্দন বা ছবি তোলার কূটনীতি দিয়ে এখন আর চলবে না। বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হবে। আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে 'করিডোর ডিপ্লোম্যাসি' এবং ইস্যুভিত্তিক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।'
সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান বিশেষ দূত।
