নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার করতে পারবে না: ইসি আনোয়ারুল
নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
তিনি বলেন, 'নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার করতে পারবে না। তবে গণভোট দেওয়ার বিষয়ে প্রচার করতে পারবেন।'
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় নির্বাচনি অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি সংসদ নির্বাচনের মূল আইন 'গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ' (আরপিও)- অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
গণভোট অধ্যাদেশের (অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি) ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে যেসব কাজ অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, একই ধরনের কাজ গণভোটের ক্ষেত্রেও অপরাধ ও লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের জন্য ডিসি ও ইউএনওদের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ইসি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে সরকারি গেজেটে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত, এই কর্মকর্তারা ইসির নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় কাজ করেন—সরকারের অধীনে নয়।
এই সময়ে ইসির অনুমোদন ছাড়া সরকার তাদের বদলি করতে পারে না এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হলে তা 'নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১'-এর অধীনে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
একবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলগুলোর জন্য প্রযোজ্য নির্বাচনি আচরণবিধি বর্তমান প্রচারণা ও গণভোটের জন্যও প্রযোজ্য। আইনি জটিলতা এখানেই আরও গভীর হয়।
গণভোট অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারাই পদাধিকারবলে গণভোট পরিচালনার কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য হবেন। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার পর উভয় প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে তারা আইনত বাধ্য।
ইসি আনোয়ারুল বলেন,'গণভোটের বিষয়ে কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে- গণভোটের জন্য আমরা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছি। তবে নির্বাচনি কাজের দায়িত্বে যারা থাকবেন, তারা আইনগতভাবে কোনো পক্ষে কাজ করবেন না।'
তিনি বলেন, 'রিটার্নিং অফিসার, সহকারি রিটার্নিং অফিসার এবং অন্যান্য যারা নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন, তারা গণভোটের প্রচার করবে, কিন্তু পক্ষে-বিপক্ষে যাবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'রিটার্নিং অফিসার কোনো পক্ষের লোক না। আমাদের কোনো রিটার্নিং অফিসার, সহকারি রিটার্নিং অফিসার কোনো পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে না।'
সরকার ও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা গণভোটের 'হ্যাঁ'- এর পক্ষে প্রচারণা করছেন। এটা আসলে কতটা আইনসঙ্গত বলে মনে করছেন- এ প্রশ্নের জবাবে ইসি বলেন, 'নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আমি কোন মন্তব্য করতে রাজি না।'
এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ এবং মাঠ কেমন আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, নির্বাচন কমিশন মনে করে অতীতের অনেক নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার আছে।'
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি বলেন, 'কমিশন কোনো শঙ্কা প্রকাশ করছে না। পাশাপাশি প্রতিনিয়তই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমাদের সঙ্গে আসছেন। উনাদের পরামর্শ, পর্যবেক্ষণ আমাদের দিচ্ছেন। সে অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, 'এছাড়াও গণমাধ্যম এবং সামাজিকমাধ্যমে যে বিষয়গুলো আসছে, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা রিটার্নিং অফিসারের নজরে আনছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।'
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সরকারের প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, 'এটা অন্তর্বর্তী সরকার। এটি রাজনৈতিক কোনো সরকার নয়, এখানে কোনো প্রার্থী নেই। আচরণবিধিতে বলা আছে- যারা রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন করবেন, তারা এই কাজটা করতে পারবেন না। সরকার তো তো রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে করছে।'
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে জামায়াত ও এনসিপির ইসিতে করা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোন জায়গায় নেই, কেন নেই? সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর প্রত্যেকটাই আমরা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার এবং ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে পাঠিয়েছি। তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।'
কমিশনের প্রতি মানুষের অনাস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আস্থা-অনাস্থার বিষয়টি জনগণের। আমরা মনে করি শতভাগ আস্থার সঙ্গে জনগণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিচ্ছে এবং একটা উৎসবমুখর পরিবেশে মাঠে-ঘাটে প্রচারণা চলছে। এগুলো আস্থার বহিঃপ্রকাশ।'
একটি দল থেকে নির্বাচন না হওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে- এ আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'নির্বাচন কমিশন মনে করে কোনো আশঙ্কা সঠিক হবে না। ইনশাল্লাহ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সবাই দেখবে, জাতি দেখবে, বিশ্ব দেখবে, একটি সুন্দর নির্বাচন হয়েছে।'
ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলব- সবাই ভোট দেন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন। আপনার যাকে খুশি তাকে ভোট দেন।'
ভোটারদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, 'কমিশনের পক্ষ থেকে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ বাহিনী, আনসার বাহিনী, এমনকি বিএনসিসিকেও অন্তর্ভুক্ত করছি। যাতে জনগণ বিশ্বাস করে নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাবে, ভোট দিয়ে বাড়িতে ফিরবে এবং ভোট পরবর্তী সময়েও কোন বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটবে না।'
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, '৮ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২৮টি আসনে ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯৪টি মামলা করা হয়েছে।'
