দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় ঐতিহাসিক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর
কাজির দেউড়ির যানজট আর কোলাহল পেরিয়ে কয়েক পা এগোলেই জিয়া স্মৃতি জাদুঘর। পুরোনো ভবন, উঁচু ছাদ, দেয়ালে দেয়ালে ফাটল। কোথাও রঙ উঠে গেছে, কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। আলো কম, গরমে ফ্যান ঘুরলেও স্বস্তি নেই।
চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই জাদুঘরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ভবনটি জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। অবকাঠামোর পাশাপাশি ভেতরে সংরক্ষিত মূল্যবান নিদর্শনগুলোর অবস্থাও দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাদুঘরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া গ্যালারি বোর্ড ও ভাঙনের মুখে থাকা শোকেস। ডিওরামা ও আলোকচিত্রে জমে আছে ধুলো ও আর্দ্রতা। পর্যাপ্ত আলো ও ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, প্রকাশনা ও ঐতিহাসিক আলোকচিত্র সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম শহরের কাজির দেউড়িতে ৩ দশমিক ১৭ একর জায়গাজুড়ে 'লাট সাহেবের কুঠি' ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯১৩ সালে, ব্রিটিশ আমলে। পরবর্তী সময়ে এটি সার্কিট হাউস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই ভবনেই সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। সেই ঘটনায় পরে ওই ভবনটিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় 'জিয়া স্মৃতি জাদুঘর'।
১৯৮১ সালের ৩ জুন মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এই স্মৃতিবিজড়িত ভবনটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এটি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
জাদুঘরে বর্তমানে মোট ৪২২টি নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত পোশাক, খাট, চেয়ার, আয়না ও জুতা, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র, বিভিন্ন প্রকাশনা ও উপহারসামগ্রী। সব মিলিয়ে এখানে ১৭টি গ্যালারি রয়েছে। গ্যালারিগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব জীবন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, সেনানায়ক, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়ার ভূমিকা, শাহাদাত কক্ষ এবং অন্তিম যাত্রার তথ্য ও নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
তবে কাঠামোগত দুরবস্থার কারণে অনেক গ্যালারি এখন দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ নয়। গত ২ ডিসেম্বরের ভূমিকম্পে ভবনের দেয়াল ও সিঁড়ির আশপাশে নতুন করে ফাটল দেখা দেয়। কয়েকটি জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ে। সে সময় জাদুঘরে দর্শনার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন, যা নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। এরপর জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক অর্পিতা দাশ গুপ্ত বলেন, জাদুঘরটি ১১৩ বছরের পুরোনো একটি স্থাপনা। সংস্কারকাজের পরিকল্পনা চলমান থাকলেও এখনো তা শুরু হয়নি।
তিনি জানান, গত পাঁচ বছর ধরে এখানে কর্মরত থাকাকালে কর্মচারী সংকট ও ভবনের বিভিন্ন সমস্যার কথা নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হলেও কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, শুক্রবার বিকেল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে জাদুঘরের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার দর্শনার্থী অবস্থান করেন। ভবনটি এত মানুষের ভার বহন করার মতো উপযুক্ত নয়।
"দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আপাতত জাদুঘর বন্ধ রাখা হয়েছে। কবে এটি পুনরায় চালু করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি," যোগ করেন তিনি।
জানা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জাদুঘরের মূল অডিটোরিয়াম ভবনটি বন্ধ রয়েছে। সেমিনার হলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জেনারেটর ও আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম অচল অবস্থায় আছে। মাত্র দুটি মাইক্রোফোন দিয়ে কোনোরকমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। লোকবল সংকটও জাদুঘরের একটি বড় সমস্যা। ৪৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩২ জন। কিউরেটর, হিসাবরক্ষক ও লাইব্রেরিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় একজন কর্মীকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, এতে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত কার্যক্রম। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার না হলে জাদুঘরের কার্যক্রম আরও সীমিত হয়ে পড়বে।
গত বছরের ১৯ মে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জাদুঘর নিয়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, "জিয়া স্মৃতি জাদুঘর আমরা পরিদর্শন করেছি। এটি শুধু চট্টগ্রামের বিষয় নয়। জিয়াউর রহমানের পূর্ণাঙ্গ জীবন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা, কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখানে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় কী কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, সেসব বিষয় দর্শনার্থীদের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "এসব বিষয় কীভাবে সঠিকভাবে দর্শনার্থীদের কাছে উপস্থাপন করা যায়, তার জন্য একটি উপযুক্ত কিউরেটর টিম প্রয়োজন। সেই টিম আমরা তৈরি করছি। জিয়া স্মৃতি জাদুঘর প্রায় ১৫–১৬ বছর ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। এটি আমার মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান, ফলে এর দায়ভার আমাদের ওপরই পড়ে।"
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই উপদেষ্টা বলেন, "প্রায় তিন মাস আগে মন্ত্রণালয়ে একটি অভ্যন্তরীণ সভা হয়েছে। সেখানে প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের বরাদ্দ দ্বিগুণ করা। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক মিউজিয়ামে রূপান্তর করাই মূল লক্ষ্য। সে জন্য প্রয়োজন দক্ষ কিউরেটর, যারা বিষয়গুলো গভীরভাবে বুঝবেন।"
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আলীউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে অধিগ্রহণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, 'শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেহেতু এই ভবনেই নিহত হন এবং তার রক্ত, পোশাকসহ সংশ্লিষ্ট স্মারক এখানে সংরক্ষিত রয়েছে, তাই স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তবে দীর্ঘদিন ধরে এটি বিভিন্নভাবে অবহেলিত ছিল।"
তিনি আরও বলেন, "প্রায় ১৮ বছর যদি একটি ভবন সংস্কার না করা হয়, তাহলে এ ধরনের ক্ষতি হওয়াই স্বাভাবিক। আমরা চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র থেকে বিষয়টি সংরক্ষণের জন্য অবহিত করেছি। আগামী এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্টরা এসে ভবনটি পরিদর্শন করবেন এবং প্রত্নসম্পদ আইন অনুযায়ী কীভাবে এটি সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেবেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি প্রত্নসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে ভবনটি সংরক্ষণ করে, তাহলে এটি আরও দীর্ঘদিন টেকসই থাকবে।"
