‘লন্ডনে গিয়ে মুফতি হয়ে গেছেন, ফতোয়া দিচ্ছেন কে কাফের কে মুশরিক’: মিয়া গোলাম পরওয়ার
একজন মুসলমান হয়ে অন্য মুসলমানকে 'কাফের' বলাকে বড় অপরাধ এবং রাজনৈতিক 'শিষ্টাচারবহির্ভূত' বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আরাফাত নগর এলাকায় আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
তারেক রহমানের প্রতি উদ্দেশ্য করে জামায়াত নেতা বলেন, 'আমরা ধারণা করেছিলাম যে উনি বিদেশে লন্ডনে গেছেন, লেখাপড়া করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু দেখি যে উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে মুফতিয়ে ফতোয়া দিয়ে দিচ্ছেন যে কে মুশরিক আর কে কাফের।'
তিনি আরও বলেন, 'এটা তার কোনো অধিকার নেই। এটা উনি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কাজটা সৌজন্যতা, শিষ্টাচারবোধের সাথে এই কথাটা যায় না। এটার জন্য আমরা তীব্র প্রতিবাদ করি। এটা বলার অধিকার উনার নাই।'
এর আগে বৃহস্পতিবার তারেক রহমান ১৬ ঘণ্টায় সাত জেলায় নির্বাচনী জনসমাবেশ করেন। এসব সমাবেশে কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, 'কাবা শরিফের মালিক আল্লাহ, এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, গ্রহ-নক্ষত্রের মালিক আল্লাহ, বেহেশতের মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ; যেটার মালিক আল্লাহ, তারা এটা দেওয়ার কথা বলে আপনাদের দিয়ে শিরক করাচ্ছে। তারা মানুষকে ঠকাচ্ছে।'
তারেক রহমানের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই কড়া প্রতিক্রিয়া দেখান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, 'ইসলাম সম্পর্কে যারা পড়াশোনা করেছেন, যারা স্কলার, যারা পন্ডিত, যারা ফকিহ, যারা মুফতি—তারা মুসলমানদের কোন বিষয়ে ভুল-ত্রুটির বিষয়ে তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, দে হ্যাভ দ্য রাইট। কিন্তু তিনি তো এটা অধিকার রাখেন না। তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন। সেজন্য আমরা এটার কথাটার খুব তীব্র নিন্দা করি।'
'একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে কাফের বলতে পারে না, এটা হাদিসে পরিষ্কার নিষেধ করা হয়েছে। সে যদি নামাজও না পড়ে, রোজাও না রাখে, তার আমলে যত ত্রুটি থাকুক—শুধু আল্লাহ-রসূল, পরকালকে বিশ্বাস করলে তাকে কাফের বলা যায় না, যদি তৌহিদকে বিশ্বাস করেন। তিনি একটা বড় অপরাধ করেছেন, কী পরিমাণ অপরাধ করেছেন তিনি নিজে যেন আত্মসমালোচনা করেন। এটা তার ওপরেই আমি ছেড়ে দিলাম', আরও বলেন তিনি।
জামায়াতকে 'রাজাকার' বা 'স্বাধীনতাবিরোধী' বলার জবাবে জামায়াত নেতা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, 'উনারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুগুলোর ব্যাপারে যা মনে রাখতে বলেন, আমি উনার সম্মানিত পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও উনার প্রয়াত মায়ের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেই বলছি—উনাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্যেই উনার প্রশ্নের জবাব আছে।'
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, '৭৯-এর পার্লামেন্টে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায়, যারা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন—এরকম ১৪-১৫ জনের নাম আমরা দিতে পারব। তাদেরকে উনার পিতাই প্রধানমন্ত্রী করেছেন শাহ আজিজুর রহমানকে। প্রেসিডেন্ট করেছেন আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে। প্রচুর এমপি ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন। এই প্রশ্নের জবাব উনি তাদের কাছ থেকে নেবেন।'
'থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি'
গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, ৭১-এ রাজাকার ইস্যু শেখ মুজিবুর রহমান সমাধান করে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, 'এটা শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বলা হয়, তিনি জীবিত অবস্থায় এটাকে তিনি সমাধান করে গেছেন। ইট ওয়াজ ডিসাইডেড ম্যাটার [এটি মীমাংসিত বিষয়]।...ওই সময় যারা রাজনৈতিক ইস্যুতে যারা দ্বিমত করেছেন—ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছিল, আপনারা সবাই জানেন।'
'তখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল আব্দুল আজিজ, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল স্বরণ সিং, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল ডক্টর কামাল হোসেন। তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা চুক্তিবদ্ধ করে তারপরে সিমলা চুক্তি হয়ে, ফরগিভ এন্ড ফরগেট—শেখ মুজিবুর রহমান জেনারেল অ্যামনেস্টি [সাধারণ দায়মুক্তি] দিলেন, কলাবোরেটর [রাজাকার] অ্যাক্টকে তুলে নিলেন, সব মামলা তুলে নিয়ে ব্যাপারটা তিনি কিন্তু মীমাংসা করে গেছেন', আরও বলেন তিনি।
তিনি বলেন, 'সবাইকে নিয়ে উনি [শেখ মুজিব] চলতে চেয়েছিলেন। সে কাজটা জিয়াউর রহমানও করে গেছেন। এখন পলিটিক্যাল ব্যাড ইনটেনশনে [রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে] যদি আবার আপনারা সেই ৭১-কে ব্যবহার করেন, তাহলে কী হলো? ওই ফ্যাসিবাদদেরকে যে দোষ দেই, সেই ন্যারেটিভ তো আপনাদের কাছেও দেখা যাচ্ছে। আপনাদের সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি।'
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনে জামায়াতের সহায়তা নেওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেন এই জামায়াত নেতা। তিনি বলেন, 'উনার [তারেক রহমান] মা যখন বিএনপি নেত্রী, ৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী ১৮টা আসনে জিতল। আমরা তখন কোনো জোট করিনি। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির আসন সংখ্যা এমন হয়ে দাঁড়াল যে, জামায়াতের সমর্থন ছাড়া কেউ আর সরকার গঠন করতে পারে না।'
তিনি দাবি করেন, 'তখন দুই দলই আমাদের অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের মগবাজারের বাসায় সিনিয়র নেতাদের পাঠিয়েছিলেন। জামায়াত সেদিন বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ও আধিপত্যবাদী শক্তির হাতে দেশটা চলে না যাক—সেই বিবেচনায় বিএনপিকেই সরকার গঠনের জন্য ১৮ জন এমপির নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'মানুষ একটা দলকে সরকার গঠনে সাহায্য করলে মন্ত্রী চায়, পদ চায়। কিন্তু উইদাউট শেয়ারিং দ্য পাওয়ার [ক্ষমতার ভাগাভাগি ছাড়াই], আমরা নিঃস্বার্থভাবে সেদিন বেগম জিয়াকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছিলাম। তাই আজকে আমি বলেছি, এই প্রশ্নের জবাব উনার আম্মার কাছে উনি জিজ্ঞাসা করতে পারতেন যে, কেন সেদিন জামায়াতে ইসলামীর কাছে গেলেন? যাদেরকে আপনি ৭১ ইস্যুতে অপরাধী মনে করেন।'
