এক দিনের মুরগির বাচ্চা আমদানিতে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ, অনুমোদনের পথে পোল্ট্রি নীতি
পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৬-এর আওতায় ডে-ওল্ড বা একদিন বয়সী ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির বাচ্চা আমদানিতে সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, ট্রানজিশনের সময়ে (রূপান্তরকালীন) পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং বাজারে দাম বেড়ে যেতে পারে।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া ইতোমধ্যে জনমত গ্রহণের জন্য সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং শিগগিরই অনুমোদনের জন্য তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে।
এ নীতিমালা পোল্ট্রি খাত ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে খাতটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কৌশলগত খাদ্য নিরাপত্তা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের দাবি, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাবে। তবে শিল্পখাত সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, প্রস্তাবিত আমদানি নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ কার্যকর হলে বাজারে সাপ্লাই চেইন (সরবরাহ শৃঙ্খল) এবং দামে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তে কৃষকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, "পোল্ট্রি শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্তে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে, কৃষকরা সময়মতো এবং ন্যায্য দামে বাচ্চা কিনতে পরছেন।"
স্বনির্ভরতা ও নিয়ন্ত্রণ
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৬-এ স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, রোগ নিয়ন্ত্রণ জোরদার, বায়োসিকিউরিটি শক্তিশালী করা, মানসম্মত ফিড ও হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কঠোর নজরদারি ও প্রয়োগের মাধ্যমে খাতে শৃঙ্খলা বাড়ানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
নীতিমালার সবচেয়ে আলোচিত ধারাগুলোর একটি হলো ডে-ওল্ড বা একদিন বয়সী ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির বাচ্চা আমদানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব। সরকার বলছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় ব্রিডার ফার্ম ও হ্যাচারিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে।
এছাড়া, পোল্ট্রি রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে উৎপাদন, পরিবহন ও বায়োসিকিউরিটি মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়গুলো নজরদারিতে আনা সম্ভব হবে।
এছাড়া খসড়া নীতিমালায় নিম্নমানের হ্যাচারি ও খামারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, মানের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য ও বিধিনিষেধ মানতে দুর্বলতার কারণে উৎপাদনে অদক্ষতা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং খামারিদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে।
পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৬ মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের দিকে এগোতে থাকায় নিয়মতান্ত্রিকতা, মাননিয়ন্ত্রণ ও দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে পোল্ট্রি খাতকে স্বনির্ভর উৎপাদন খাতে রূপ দেওয়ার সরকারের লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তবে শিল্পখাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ও রূপান্তরকালীন সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত লক্ষ্য ও বিদ্যমান বাজার বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য আনা। এই ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে নতুন কাঠামোটি খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করবে, নাকি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রোটিন খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করবে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, একটি আরও সহনশীল ও সুশৃঙ্খল পোল্ট্রি শিল্প গড়ে তুলতে এসব পদক্ষেপ জরুরি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, "সামগ্রিক খাত উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে পোল্ট্রি খাত আরও শক্তিশালী ও টেকসই হবে।"
সময় ও সক্ষমতা নিয়ে শিল্পখাতের উদ্বেগ
এসব আশ্বাসের পরও পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের দাবি, নীতিমালায় বর্তমান বাজার বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির বাচ্চার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে দেশীয় হ্যাচারিগুলো প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। বাকি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। এই আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোক্তারা জানান, খসড়া চূড়ান্ত করার আগে অনুষ্ঠিত একাধিক পরামর্শ সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টার সামনে তারা এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমদানিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হলেও চূড়ান্ত খসড়ায় ওই বিধান বহাল থাকায় শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের একজন সিনিয়র নেতা সতর্ক করে বলেন, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ করে দিলে যে চাপ সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় এ খাত এখনো পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, "এখনই যদি আমদানি বন্ধ করা হয়, তাহলে সরবরাহ সংকট দেখা দেবে। এতে বাচ্চার দাম বাড়বে, উৎপাদন কমবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাবে।"
বাংলাদেশে ডে-ওল্ড মুরগির বাচ্চা উৎপাদন মূলত কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপের হাতেই কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে কাজী ফার্মস গ্রুপ, আফতাব গ্রুপ, নাভানা গ্রুপ, প্যারাগন গ্রুপ, সিপি বাংলাদেশ, বেক্সিমকো অ্যাগ্রো ও ডায়মন্ড হ্যাচারি উল্লেখযোগ্য। শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান মিলে দেশের মোট দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে উৎপাদিত বাচ্চার বড় একটি অংশই এসব গ্রুপ নিজেদের ব্যবস্থাপনায়, চুক্তিভিত্তিক খামার বা তাদের সঙ্গে যুক্ত খামারগুলোতে ব্যবহার করে। ফলে খোলা বাজারে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত মজুত থাকে না। এর কারণে সরবরাহে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন একক ও ছোট খামারিরাই।
দাম অস্থিরতা ও নীতিগত সমঝোতা
পোল্ট্রি খাতের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ লাখ ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদিত হয়। প্রতিটি বাচ্চার উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ টাকা। তবে সরবরাহ সংকটের সময় খামারিদের ৪৮ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে লাভ কমে যায় এবং অনেক প্রান্তিক খামারি ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়েন।
সমালোচকদের মতে, সংকটকালে সীমিত পরিসরে আমদানির সুযোগ রাখা হলে দাম কারসাজি ঠেকানো যাবে এবং প্রতিযোগিতা ঠিক থাকবে। তারা আরও বলেন, ব্রিডার ও গ্র্যান্ডপ্যারেন্ট স্টক আমদানির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। এসব আমদানির অনুমোদন পেতে ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে, ফলে পরিকল্পনায় সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরাও ধাপে ধাপে বা শর্তসাপেক্ষ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. বাহানুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে দেশীয় সক্ষমতা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
তিনি বলেন, "শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হবে না, খামারিদের জন্য নিয়মিত ও সাশ্রয়ী দামে বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।"
