গার্মেন্ট রপ্তানিকারকদের চাপে ইয়ার্নে শুল্ক আরোপ থেকে সরে আসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়?
ইয়ার্ন আমদানিতে শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়ার পর তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের তীব্র চাপের মুখে সরকার ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে—এমন আভাস পাওয়া গেছে।
শিল্পখাতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা রপ্তানি প্রতিযোগিতায় সম্ভাব্য ধাক্কার বিষয়টি তুলে ধরার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর না করে বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পর্যালোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করতে চায় সরকার।
গতকাল বুধবার (২১ জানুয়ারি) বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা এস কে বশির উদ্দিনের বৈঠকের পর এই অবস্থান সামনে আসে।
বৈঠকে উপস্থিত বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "উপদেষ্টা আমাদের বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। তিনি সব তথ্য নেবেন এবং বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করবেন।"
সভায় উপস্থিত বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ইয়ার্ন আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল বা শুল্ক আরোপের যে উদ্যোগ ছিল, তা হচ্ছে না—আমরা মোটামুটি নিশ্চিত।" তিনি আরও বলেন, "অন্য কোনো পদ্ধতিতে হয়তো সরকার সহায়তা দিতে পারে।"
তিনি জানান, বৈঠকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও শিল্পখাতের অবস্থান উপদেষ্টাকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিষয়টি তিনজন স্বাধীন অর্থনীতিবিদের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে এই সংলাপে সব পক্ষের অবস্থান সমান বিবেচনায় আসেনি বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। বিটিএমএ'র প্রতিনিধিত্বে টেক্সটাইল মিল মালিকরা আলাদাভাবে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করলেও তাতে তাদের পক্ষে ইতিবাচক কোনো সাড়া মেলেনি।
বিটিএমএর সভাপতি বলেন, "সরকারি সংস্থাগুলো বুঝেও না বোঝার ভান করছে।"
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ইয়ার্ন আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে। দেশের স্পিনিং মিলগুলোর অভিযোগ, ভারত বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার কারণে স্থানীয় বাজারের তুলনায় প্রতি কেজি প্রায় শূন্য দশমিক ৩০ ডলার কম দামে বাংলাদেশে ইয়ার্ন রপ্তানি করছে। এতে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত ইয়ার্ন বিক্রি হচ্ছে না।
এর ফলে বিপুল পরিমাণ ইয়ার্ন মজুত হয়ে আছে এবং কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক অব্যবহৃত থাকছে। এসব কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি টেক্সটাইল মিল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের এই খাতের উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে সরকারের কাছে জরুরি সিদ্ধান্তের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, গার্মেন্ট রপ্তানিকারকরা সতর্ক করে বলেছেন, শুল্ক আরোপের ফলে নিটওয়্যার উৎপাদন ব্যয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে, যা দেশের ২৮ বিলিয়ন ডলারের নিটওয়্যার রপ্তানি খাতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে টেক্সটাইল মিল মালিকদের দাবি, ক্রেতাদের সঙ্গে করা ওপেন-কস্টিং চুক্তির মাধ্যমে ব্যয়ের একটি অংশ সামাল দেওয়া সম্ভব। রপ্তানিকারকদের মতে, পণ্যের দাম বাড়লে চুক্তি হারানো এবং বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
