গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ২ ঘন্টার মধ্যে জামিন পেলেন ট্রান্সকমের সিমিন রহমান
ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলার চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতা শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত না থাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ২ ঘন্টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিমিন রহমান ও তার মা শাহনাজ রহমান।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত তাদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
বাদীপক্ষে আইনজীবী মনির হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, 'দুপুর ২টায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ'র আদালত ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, লতিফুর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ রহমান ও মো. সামসুজ্জামান পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানা জারির ২ ঘণ্টার পর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের অপর এক আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান সিমিন রহমান ও শাহনাজ রহমান।'
আদালত সূত্রে জানা যায়, সকালে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ এই মামলায় ছয় আসামির বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেওয়া চার্জশিট আমলে নেন। ওই সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় সিমিন রহমান, শাহনাজ রহমান ও ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
আদালত সূত্রে আরও জানা গেছে, মামলার অভিযুক্ত ছয় আসামির মধ্যে অন্য তিন জন—ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক ও আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক গত মঙ্গলবার আদালতে উপস্থিত হয়ে স্থায়ী জামিনের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। সিমিন রহমানসহ তিন জন অনুপস্থিত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে বুধবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ধার্য করা হয়েছে।
এদিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সিমিন রহমান ও তার মা শাহনাজ রহমান কালো বোরকা পরে ও মুখ ঢেকে আদালতে উপস্থিত হন। তাদের পক্ষে আইনজীবীরা জামিন আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত ৫শ টাকা মুচলেকায় তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক বাদী হয়ে গুলশান থানায় এই মামলাটি করেন। তদন্ত শেষে গত ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান সিমিন রহমানসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
মামলার চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ১৩ জুন অনুষ্ঠিত একটি বোর্ড মিটিংয়ের এজেন্ডায় লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হলেও আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর ছিল, অথচ তখন তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন। এই কথিত মিটিংয়ের মাধ্যমেই লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি এবং আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও শাযরেহ হককে ৪ হাজার ৭২০টি করে শেয়ার হস্তান্তর দেখানো হয়।
বাদী শাযরেহ হকের দাবি, ২০২০ সালের ১৩ জুন এ ধরনের কোনো বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিতই হয়নি। তদন্তকালে আসামিপক্ষ এই মিটিং বা রেগুলেশনের কোনো বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। এমনকি আরজেএসসিতে (যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর) শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক থাকলেও সেখানে শুধু আসামিপক্ষের আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন।
চার্জশিটে আরও বলা হয়, সিমিন রহমান ভাই-বোনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে অধিকাংশ শেয়ার নিজের নামে নেওয়ার জন্য পারিবারিক 'ডিড অব সেটলমেন্ট' ও ভুয়া নথি তৈরি করেন। তদন্তে দেখা গেছে, শাযরেহ হকের নামে যে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এফিডেভিট করা হয়েছে, সেগুলো ২০২৩ সালে তৈরি করা। অথচ সেগুলোকে ২০২০ সালের বলে চালানো হয়েছে। ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিবেদনেও এই জালিয়াতির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ভেন্ডরের লাইসেন্স ২০২০ সালের ডিসেম্বরেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল, অথচ তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে পেছনের তারিখে (২০২০ সালের মার্চ) স্বাক্ষর করে আসামিপক্ষকে সরবরাহ করেছিলেন।
