ঢাকা বাঁচাতে নগর সরকার গঠনের দাবি বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদদের
ঢাকাসহ দেশের নগরগুলোর বর্তমান দুরবস্থার জন্য চরম সমন্বয়হীনতা ও সিটি মেয়রদের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকাকে দায়ী করেছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, একটি শক্তিশালী 'নগর সরকার' গঠন করার মাধ্যমেই নগরের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে নগর সরকার গঠন ও নগরের সমস্যা সমাধানে স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল লেকশোরে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ ও গুলশান সোসাইটি আয়োজিত 'ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার' শীর্ষক এক নগর সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, 'সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান ক্ষমতা মূলত ময়লা পরিষ্কার এবং বাতি লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকায় উচ্ছেদ অভিযানগুলো টেকসই করা সম্ভব হচ্ছে না।' তিনি একটি বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা বাবদ মাসে প্রায় ১৯ থেকে ২২ কোটি টাকা আদায় হয়। 'এই জরিমানার এক টাকাও সিটি কর্পোরেশন পায় না; এই বিশাল অংকের অর্থ সরাসরি কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে চলে যায়। অথচ ট্রাফিক সিগন্যাল ও অবকাঠামো উন্নয়নে সিটি কর্পোরেশনকে শত শত কোটি টাকা খরচ করতে হয়।'
তার মতে, ওয়াসা, রাজউক এবং পুলিশকে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ 'সিটি গভর্নমেন্ট' প্রতিষ্ঠা না করলে শহরের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়। এখানে জলবায়ু উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের জন্য 'আরবান সেফটি' এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, 'বর্তমানে রাজউক, সিটি কর্পোরেশন এবং অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য গত সরকার ঢাকা সিটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল।' তিনি আরও বলেন, 'সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া মেয়রের পক্ষে অনেক কাজই করা সম্ভব নয়, কারণ বর্তমানে মেয়রের হাতে এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশি ক্ষমতাও নেই। ঢাকার মেয়রকে স্থানীয় সরকারের অধীনে না রেখে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসা উচিত, যাতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।'
ঢাকার উন্নয়নে বিএনপির ১০টি লক্ষ্য ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, এই লক্ষ্যগুলো হলো- ১. পরিচ্ছন্ন ঢাকা নিশ্চিত করা, ২. সমর্পিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, ৩. যুবকদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ৪. রাস্তা ও ফুটপাতগুলোকে কার্যকর করা, ৫. মাদকমুক্ত সমাজ গঠন, ৬. সুবিধা-বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা, ৭. নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, ৮. আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ৯. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করা এবং ১০. নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী (ঢাকা-১৭) ডা. এস. এম. খালেদুজ্জামান বলেন, 'রাজনীতিবিদরা ঢাকার শহর গড়ে দেবে এটা ভুলে যান। আমাদের শহর আমরা সবাই মিলে গড়ব। এমন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন না, যে কথা রাখে না।' তিনি আরও বলেন, 'বুড়িগঙ্গা নদীকে নিয়ে আমাদের বাপ-দাদারা স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেটিকে নানা অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বসবাসের অযোগ্য শহরে পৌঁছে দিয়েছি। আমরা ঢাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।'
জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, 'আমাদের ইশতেহারে ঢাকা বাঁচাতে ১০টি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো সমন্বিত সরকার ব্যবস্থা। সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ডেসাসহ অনেকগুলো সংস্থা থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া টেকসই অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, যত্রতত্র শিল্প কারখানা রোধ, নারীর নিরাপত্তা, সড়ক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার অগ্রাধিকার থাকবে আমাদের ইশতেহারে।'
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. মুসলেহ উদ্দীন হাসান আক্ষেপ করে বলেন, 'আমরা ঢাকাকে নগরায়ণ না করে নরকায়ন করছি। বর্তমানে শহরগুলোকে নাগরিকদের পরিবর্তে 'সিটিস ফর কনক্রিট অ্যান্ড কার' (কংক্রিট এবং গাড়ির শহর) হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।' তিনি বলেন, গণপরিসরের সংকট দেখা দিচ্ছে; এমনকি তেঁতুলতলার মাঠ, বনানী লেকের মতো জায়গাগুলোও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এবং জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, দেশে দূষিত এলাকায় বসবাস করে ৪ কোটি মানুষ। একটি শহরে জলাভূমি থাকা দরকার ২৫-৩০ ভাগ, সেখানে আছে খুবই সামান্য। নদী, খাল, জলাশয় ক্রমান্বয়ে দখলের কবজায় চলে গেছে। এগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
মূল প্রবন্ধে ওমর সাদাত এক ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে বলেন, বায়ু দূষণে ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা পাওয়া গেছে। শিকাগো ইউনিভার্সিটির সর্বশেষ এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী, বায়ু দূষণের কারণে ঢাকার মানুষের গড় আয়ু কমছে ৭ বছর ৭ মাস। গড় আয়ু ৭২ বছর হলেও ঢাকার বায়ু দূষণের কারণে আমরা বাঁচি মাত্র ৬৫ বছর। এছাড়া ৪৫ শতাংশ পানির নমুনায় ব্যাকটেরিয়া, আয়রন ও অ্যামোনিয়া পাওয়া গেছে।
সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, স্থপতি রফিক আজম, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ মো. নুরুল্লাহ, গুলশান সোসাইটির সহ-সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির এবং নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমন প্রমুখ।
