রাজধানীতে বেপরোয়া ছিনতাইয়ে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ছিনতাইয়ের অভিযোগ বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ভুক্তভোগীদের অনেকেই মামলা করতে চান না।
সম্প্রতি পারিবারিক এক অনুষ্ঠান শেষে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন এসকেএফ ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল সার্ভিস অফিসার সোহেলি ইসলাম (৪২)। গত রোববার (৭ জুন) ভোরে বাস থেকে গাবতলীতে নেমে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের বাসায় যাচ্ছিলেন তিনি। পথে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে তারা ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন।
স্বজনরা জানান, মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ছিনতাইকারী সোহেলির হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে চলন্ত রিকশা থেকে রাস্তায় পড়ে মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ভেঙে যায় ডান হাত। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে। চার দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ভোরে মারা যান তিনি।
এই ঘটনায় শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি মামলা করেছেন নিহতের মামা লিটন। তবে এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ উত্তরায় মেট্রো স্টেশনের কাছে একইভাবে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে সড়কে ছিটকে পড়ে নিহত হন গৃহিণী মুক্তা আক্তার (২১)। ঈদের কেনাকাটা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। অটোরিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীরা প্রাইভেটকারে এসে তার হাতে থাকা ব্যাগ টান দেয়। এতে রিকশা থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পান মুক্তা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিনই তিনি মারা যান।
ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে এমন নির্মম মৃত্যুর ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটলেও রাজধানীতে নিয়মিতই ঘটছে ছিনতাই। বিশেষ করে মধ্যরাত ও ভোরে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে কিছু বড় ঘটনায় থানায় মামলা হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেওয়া হয় মোবাইল বা টাকা-পয়সা হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি)।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডিএমপির ৮টি অপরাধ বিভাগে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩৪টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মে মাসে, ৩৩টি।
এ ছাড়া মার্চ ও এপ্রিল মাসে মামলা হয়েছে ২৫টি করে, ফেব্রুয়ারি মাসে ২২টি এবং জানুয়ারি মাসে ২৯টি। অর্থাৎ, গত কয়েক মাসের তুলনায় মে মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। চলতি জুন মাসেও রাজধানীজুড়ে বেশ কয়েকটি আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) ছিনতাইয়ের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ওয়ারী বিভাগে, ৩২টি। সবচেয়ে কম মামলা হয়েছে লালবাগ বিভাগে, ৪টি। এ ছাড়া রমনা বিভাগে মামলা হয়েছে ১২টি, মতিঝিল বিভাগে ২১টি, তেজগাঁও বিভাগে ২৪টি, মিরপুর বিভাগে ১৪টি, গুলশান বিভাগে ১৫টি এবং উত্তরা বিভাগে ১৪টি।
রাজধানীতে সক্রিয় ১,৩৮৭ ছিনতাইকারী
বর্তমানে রাজধানীতে ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারী রয়েছে ওয়ারী বিভাগে, ৩০৮ জন। সবচেয়ে কম রয়েছে মিরপুর বিভাগে, ৫৩ জন। এ ছাড়া রমনা বিভাগে ১৫২ জন, লালবাগ বিভাগে ১৫৯ জন, মতিঝিল বিভাগে ১৬৮ জন, তেজগাঁও বিভাগে ২৪০ জন, গুলশান বিভাগে ৬৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন ছিনতাইকারী রয়েছে। এসব ছিনতাইকারীর ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে।
ওয়ারী বিভাগে ছিনতাই ও ছিনতাইকারী বাড়ার কারণ জানতে চাইলে এই বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ওয়ারী বিভাগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ পড়েছে, যা ছিনতাইয়ের অন্যতম কারণ। মহাসড়কগুলোতে যানজট হলে ছিনতাইকারীরা জানালা দিয়ে মোবাইল টান দেয়। আবার অনেক যাত্রী ঢাকার বাইরে থেকে এসে ভোরবেলা নামেন। তখন তারা ছিনতাইয়ের শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনায় পুলিশ চাইলেও রাস্তার মাঝখানে টহল দিতে পারছে না। আবার এই এলাকায় ভাসমান মানুষের বসবাসও বেশি।
গত মে মাসে ১৩৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, "আমরা জনপদ মোড় থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত তালিকা করে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু এসব ছিনতাইকারী আবার কয়েক দিন পর জামিনে মুক্তি পেয়ে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। তারপরও আমরা টহল ও ব্লকেড জোরদার করেছি। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করছি।"
তিনি আরও বলেন, "কুতুবখালী পকেট গেটটি খোলা থাকায় এখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। তাই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই পকেট গেটটি বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি।"
ছিনতাইয়ে বাড়ছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার
অতীতে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করা হলেও বর্তমানে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। গত ৭ জুন বিকেলে মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় লোকমান (৪৫) নামের এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে তার সঙ্গে থাকা ১৭ হাজার ডলার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
ছিনতাইকারীরা ওই ব্যবসায়ীর পায়ে ও হাতে তিনটি গুলি করে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলেও এখনো কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ব্যবধান থাকায় ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "রাজধানী ঢাকায় চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা গ্রহণ ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে।"
বর্তমান বাস্তবতায় চুরি ও ছিনতাইকে সহজে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সময় শেষ হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব অপরাধে এখন পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। অনেক অপরাধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের হাতে দেশীয় ও প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং তাদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ছিনতাইয়ের সময় তারা শুধু সম্পদ লুটেই ক্ষান্ত হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে হত্যা বা গুরুতর আহতও করে।
এই বিশেষজ্ঞের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে বাস্তবতাভিত্তিক সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের মূল হোতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সংগঠিত গ্যাংগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, "অপরাধ অর্থনীতির সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তা না হলে অপরাধ দমনে কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন হবে।"
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা বলছে
ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের মুখপাত্র এবং আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সম্প্রতি সংঘটিত অনেক ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কখনো র্যাব, কখনো পুলিশ সফল হচ্ছে; তবে অপরাধ দমনে সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
চুরি-ছিনতাই বা হত্যাকাণ্ডকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এগুলো মূলত সামাজিক অবক্ষয়েরও বহিঃপ্রকাশ। মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের অবনতি ঘটছে। ফলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জনের পরিবর্তে সহজে অবৈধভাবে অর্থ বা সম্পদ অর্জনের প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রবণতা রোধে সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও অতিরিক্ত পিপি মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, "আমাদের দেশের পুলিশের উপপরিদর্শকেরা যেমন প্রশিক্ষিত হওয়া দরকার, তেমন প্রশিক্ষিত নন। তারা মামলার চার্জশিট দিতে দেরি করেন।"
তিনি বলেন, "এ ছাড়া অনৈতিক সুবিধা নিয়ে মামলার ধারা হালকা করে দেওয়ার অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে। যে কারণে অপরাধীরা সহজে জামিন পেয়ে যায়। আবার মাদকের মামলার সাজা খুবই কম হওয়ার কারণ, এগুলোর সাক্ষী ও বাদী হয় পুলিশ। এসব মামলার শুনানি শুরু হতে হতে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বদলি হয়ে যায়। তখন তারা আর সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ দেখান না।"
এ ক্ষেত্রে আইনজীবীদের নৈতিক অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমাদের দেশের বেশিরভাগ আইনজীবীও নৈতিক নন। ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা মাদকের মামলাগুলো যখন ট্রায়ালে চলে যায়, তখন আর এটি পুলিশের কাছে থাকে না।"
