তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে ৩ লাশ উদ্ধার নিয়ে যা বলছে পুলিশ
ঢাকার তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত বুধবার ও শুক্রবার এসব মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে দাবি করা হচ্ছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকে দলটির ৭ জন নেতা-কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩-৪ জনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে পুলিশ বলছে, ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে আশুলিয়া থানাধীন গরুহাটা ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে মো. সুমন (১৭) নামের একজনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। তার ফেসবুকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিও দেখা গেছে।
এর আগে গত বুধবার সকালে গাবতলী এলাকার তুরাগ নদ থেকে আরিফ হাসান রাকিব নামের আরেকজনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে আমিনবাজার নৌ ফাঁড়ির পুলিশ ও দারুস সালাম থানা পুলিশ। আরিফও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পরিবারের বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। সুমন ও আরিফ দুজনই তুরাগ থানাধীন রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
এছাড়া একই দিন দুপুরে উত্তরার তুরাগ নদের দিয়াবাড়ি ঘাটে গোসল করতে নেমে ডুবে যান রনি মোল্লা নামের এক যুবক। ঘণ্টাখানেক পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন।
আরিফ ও রনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আরিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। মামলায় তিনি বলেছেন, গত ২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয় আরিফ। ওই দিন বিকেল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা সে কথা বলে। এরপর তুরাগ নদে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে তিনি নদীতে পড়ে যান। এছাড়া রনির মৃত্যুর ঘটনায়ও তার বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে।
এদিকে এসব মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বিএনপি নেতা-কর্মী ও পুলিশের হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকে দলটির ৭ জন নেতা-কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩-৪ জনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব প্রচার-প্রচারণা যেসব ফেসবুক আইডি থেকে করা হচ্ছে তার বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এই বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে পৃথকভাবে দুটি ব্রিফিংও করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার (২৭ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।
একটি মহল এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, যারা এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে আজ রোববার (২৮ জুন) বিকেলে ঢাকা জেলার এসপি শামীমা পারভীন সংবাদ সম্মেলন করে জানান, সুমনের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে।
ওই মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, সুমন গত ২২ জুন দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টায় স্থানীয় ২০-২২ জন বন্ধু-বান্ধবসহ তুরাগ নদে নৌকা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ধোউর ব্রিজ ঘাট এলাকায় নৌকায় উঠেন। পরে বিকাল সাড়ে ৩টায় আশুলিয়া গরুরহাট ঘাটে তাড়াহুড়া করে নৌকা থেকে নামতে গিয়ে অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যান। তিনি সাঁতার না জানায় স্রোতের সাথে নদীতে তলিয়ে যান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো জানান, এছাড়াও গত বুধবার রনি নামের আরেক যুবক সাভার থানাধীন রয়েল সিটি খেয়াঘাটে তুরাগ নদে গোসল করার জন্য পানিতে ডুব দিয়ে আর ওঠেননি। পরে স্থানীয়রা পানির নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
এসপি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ ও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টির অপপ্রয়াসে এই ঘটনা দুটিতে রাজনৈতিক রং চড়িয়ে কতিপয় স্বার্থন্বেষী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার চালাচ্ছে। ঢাকা জেলা পুলিশ অপপ্রচারকারীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য তৎপর রয়েছে।
তিনি আরো জানান, ঢাকা জেলায় গত মার্চ থেকে মে (তিন মাস) সর্বমোট ১৭০টি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলাই অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ সংক্রান্ত ঘটনা। ঢাকা জেলা ভৌগোলিকভাবে এমন জায়গায় অবস্থিত, যার ওপর দিয়ে বিভিন্ন নদ-নদী চলে গেছে। এখানে বিভিন্ন নির্জন জায়গা আছে, ঘনবসতিপূর্ণ জায়গাও আছে। অনেক সময় অন্য জায়াগায় হত্যা করার পর ঢাকা জেলায় এসে লাশ নদীতে ফেলা হয়। আবার আমিনবাজারে নদীতে গোসল করতে নেমেও অনেকে স্রোতের টানে ডুবে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কারো রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজতে যাই না। আমরা শুধু ভুক্তভোগী এবং অপরাধী- এই দুটো পরিচয়ই দেখি। তারপরও ভুক্তভোগীর পরিবার যে অপমৃত্যুর মামলা করেছে, সেখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, আমার রাজনৈতিক পরিচয় জানার সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে সাতজন নিখোঁজ হওয়ার যে খবর ছড়ানো হচ্ছে- সেই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগও কেউ করেনি।
তুরাগ নদ থেকে যে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের মিছিলে গিয়েছিল- এমন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছে। এই বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি রাজনৈতিক দল থেকে এই গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন এমন অনেক কিছু ছড়ানো হয়। আমরা গুজবকে গুজব হিসেবেই ধরি। পুলিশ কাজ করে তথ্য-প্রমাণ নিয়ে। প্রমাণ ছাড়া আমরা কথা বলি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিষয় এলে আমরা সেটি খতিয়ে দেখি। এই বিষয়টিও আমরা খতিয়ে দেখা গেছে, এটি সম্পূর্ণ অপপ্রচার। এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
চাপে পড়ে নিহতদের পরিবার অপমৃত্যু মামলা করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি এমন হতো তাহলে সাংবাদিকরাই আগে চাপ তৈরি করতেন। কিন্তু এমন কোনো অভিযোগ কোথাও থেকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে একই দিন বিকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তুরাগ নদ থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধার হওয়া সংক্রান্ত কিছু তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়াতে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। ডিএমপির উত্তরা বিভাগের আওতাধীন তুরাগ থানা এলাকায় এ ধরনের কোনো ধারাবাহিক মৃতদেহ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ড কিংবা এ সংক্রান্ত অন্য কোনো ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে এ বিষয়ে তুরাগ থানায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা দায়ের করা হয়নি।
