তাপপ্রবাহে বছরে নষ্ট ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং নগর তাপঝুঁকি দেশের শ্রমবাজার, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। তাপপ্রবাহের কারণে বছরে ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত "জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা" শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (এনএজেটিবি) এবং সহযোগিতা করে সাসটেইনেবল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন (এসএমইপি)।
আলোচনায় উপস্থাপন করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বহুমাত্রিক জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা একযোগে দেশের জনস্বাস্থ্য, শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দক্ষিণ এশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ চরম তাপমাত্রা ও জলবায়ুজনিত জীবিকা ঝুঁকির সবচেয়ে বেশি চাপ বহনকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
গোলটেবিলে জানানো হয়, ২০২৪ সালে তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে দেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা হারিয়ে গেছে। এর ফলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৪ শতাংশের সমান।
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। কর্নেল ইউনিভার্সিটির আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, কার্যকর তাপ সহনশীলতা ও জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ১০ লাখ সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে মোট প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৬ সালের শুরুতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে দেশে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং বেড়েছে। এর ফলে বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল এবং তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
আলোচনায় জানানো হয়, চরম তাপমাত্রা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্মিলিত প্রভাবে কারখানা ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা অসহনীয় পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, পেশিতে টান এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো তাপজনিত অসুস্থতা বেড়েছে।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দীর্ঘসময় তীব্র গরমে কাজ করার ফলে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, হিটস্ট্রোক এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। গর্ভবতী নারী শ্রমিক, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং বহিরাঙ্গনে কর্মরত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
আলোচকদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা কেবল শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে শ্রমিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।
আলোচনায় বলা হয়, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে 'আরবান হিট আইল্যান্ড' প্রভাব বাড়ছে। জলাধার, খাল, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শহরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বায়ুদূষণ ও উচ্চ আর্দ্রতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আলোচকরা সতর্ক করে জানান, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ খাল ও জলাধার রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
গোলটেবিলে শ্রম আইনে তাপজনিত ঝুঁকিকে পেশাগত ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পর বাধ্যতামূলক বিশ্রামের ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, নগর সবুজায়ন, তাপপ্রবাহভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (জেটনেটবিডি) প্রতিনিধি আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর থাকলেও দেশটির নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির কারণে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি রূপান্তরকে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং শ্রমিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাবকে অর্থনীতি, শ্রম এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এই তিনটি মাত্রায় বিবেচনা করে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ করে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে শ্রমিক সুরক্ষা, টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে। অন্যথায় তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক মূল্য আরও ভারী হয়ে উঠবে।
