ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ সরকারের
দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপে ঢাকা যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাজধানীর চারপাশের জেলাগুলোতে সমন্বিত ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এই লক্ষ্যে 'ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল কৌশলগত পরিকল্পনা' শীর্ষক সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব করছে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি)।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকাকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা না করে পুরো মহানগর অঞ্চলের উন্নয়নকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ইউডিডির মতে, ঢাকা এককভাবে আর টেকসইভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। আশপাশের জেলাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া ভবিষ্যতে নগরায়ন হবে আরও বিশৃঙ্খল।
কর্মকর্তারা বলছেন, এ পরিকল্পনা কেবল একটি সমীক্ষা নয়; এটি হবে ঢাকা মহানগর অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নগরায়নের মূল রোডম্যাপ।
পরিবহন-কেন্দ্রিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব
ইউডিডি কর্মকর্তারা বলেন, প্রকল্পটির প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি সমন্বিত ও টেকসই পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং সেই পরিবহন নেটওয়ার্ককে ভিত্তি করে আবাসন, বাণিজ্যিক এলাকা ও অন্যান্য অবকাঠামোর পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
একইসঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে নগর পরিষেবা ও সর্বজনীন স্থানসমূহের কার্যকর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে একটি বসবাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষ নগর পরিবেশ সৃষ্টি করাও এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
ইউডিডির পরিকল্পনাবিদ ফৌজিয়া শারমিন তিথি বলেন, এই উদ্যোগে পরিবহন-কেন্দ্রিক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'বিশেষ করে ঢাকার বাইরের পেরিফেরাল এলাকায় অবস্থিত ১২টি উপজেলাকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো পরিবহন অবকাঠামোর সঙ্গে নগর ও গ্রামীণ উন্নয়নকে সমন্বিত করা।'
ফৌজিয়ার শারমিন আরও বলেন, 'এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা স্ট্রাকচার প্ল্যান, স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান এবং রুরাল এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করব। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যানও করা হবে।'
তিনি জানান, আগে পরিকল্পনা হতো মূলত উপজেলা বা জেলা-ভিত্তিক। 'এখন আমরা সেই ধারণা থেকে সরে এসে পুরো জেলার জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছি। এই প্রক্রিয়ায় কাজ করতে গিয়ে আমরা উপলব্ধি করেছি যে ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোকে একত্রে কাভার করতে পারলে তা পরিবহন উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি কার্যকর হবে।'
আশপাশের অনেক এলাকায় ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'এখন সেগুলোকে সমন্বিত করে ট্রান্সপোর্ট ডেভেলপমেন্টকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা নেওয়াটাই সবচেয়ে যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে পরিবহন খাত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, গবেষণা ও নীতিগত গুরুত্ব বাড়ছে—এই প্রেক্ষাপটে এটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।'
প্রকল্পের পরিকল্পনায় কী আছে?
প্রকল্পটির প্রস্তাবনা সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯.৪৩ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ঢাকা ইতিমধ্যেই বিশ্বের চতুর্থ ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি। দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে যানজট, পরিবেশগত ক্ষতি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এমআরটি, বিআরটি ও প্রস্তাবিত ঢাকা সাবওয়ে নেটওয়ার্কের মতো বৃহৎ পরিবহন প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর (গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ) সমন্বিত পরিকল্পনা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজারের বেশি মানুষ যুক্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে জনঘনত্ব, অবৈধ দখল, আবাসন সংকট, গণপরিবহনের চাপ, যানজট, পানি ও বায়ুদূষণ এবং ড্রেনেজ সংকট—সবকিছুর তীব্রতা বেড়েছে গত এক দশকে।
কিন্তু ঢাকা-কেন্দ্রিক উন্নয়ন কৌশল সেই গতি সামাল দিতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তারা।
২০১৬ সাল থেকে রাজধানীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও ব্যয়বহুল ও পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ঢাকার বাইরে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জে সমন্বিত উন্নয়ন গড়ে তুলতে না পারলে ঢাকা একটি 'অতিরিক্ত কেন্দ্রিভূত, অকার্যকর ও অব্যাহতভাবে চাপসৃষ্টিকারী শহরে' পরিণত হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত হবে, কৃষিজমি ও পরিবেশ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছে ইউডিডি।
তিন স্তরের পরিকল্পনা কাঠামো
নগর উন্নয়র অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পনা প্রণয়ন তিনটি স্তরে সম্পন্ন করা হবে।
এতে উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে জেলাভিত্তিক ২০ বছর মেয়াদি স্থানিক উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করা হবে, যেখানে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই স্তরের পরিকল্পনা আঞ্চলিক সংযোগ, বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও টেকসই ভূমি ব্যবহারের দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
উপজেলা পর্যায়ে কাঠামোগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে, যেখানে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ঝুঁকি বিশ্লেষণ, কৃষিজমি ও জলাশয় সংরক্ষণ, গ্রামীণ বসতি, নগরায়ন এলাকা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ অঞ্চল সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হবে।
একইসঙ্গে বিশেষায়িত পরিকল্পনা প্যাকেজের আওতায় নগর অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউএপি), গ্রোথ সেন্টার পরিকল্পনা, হাইওয়ে করিডোর পরিকল্পনা, সর্বজনীন স্থান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে পরিকল্পনাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
কৌশলগত পরিকল্পনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এই মাত্রার জনসংখ্যা বর্তমানে বিদ্যমান অবকাঠামোর মাধ্যমে সামলানো সম্ভব হবে না।
বর্তমানে দেশের মোট জিডিপিতে ঢাকার অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ। কিন্তু ক্রমবর্ধমান নগরায়নের চাপের কারণে এর কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে রাজধানীর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সার্বিক উৎপাদনশীলতা কমছে।
পরিবহন খাতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যানজট ও দূষণের কারণে পরিবহন খাতে উৎপাদনশীলতা বছরে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সময়ের অপচয় বাড়াচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, বিশেষ করে আশপাশের জেলাগুলোতে, ঢাকার ওপর চাপ আরও বাড়াবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীরগতি করবে এবং স্থায়ী সমাধান ব্যাহত করবে।
এ কারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনাকে 'ভবিষ্যৎ রাজধানীর বেঁচে থাকার পরিকল্পনা' বলা হচ্ছে, যা ঢাকার টেকসই ও কার্যকর নগরায়ন নিশ্চিত করবে বলে ধারণা করছে ইউডিডি।
ইউডিডির তথ্যমতে, সমীক্ষা প্রতিবেদনে ঢাকার আশপাশের উপজেলাগুলোতে পরিবহন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হাইওয়েগুলো উন্নত করা হবে এবং রাস্তার শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও গ্রোথ সেন্টারগুলোকে সংযুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
মহাসড়কের পাশে স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড রাখা হবে, আঞ্চলিক সংযোগ তৈরি ও ট্রাফিক ডাইভার্টের মাধ্যমে যানজট কমানোর কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
মালবাহী পরিবহন ও রেল জংশনে মাল্টিমোডাল সুবিধা , হাইওয়ের পাশে অপরিকল্পিত উন্নয়ন সীমিত করা হবে এবং গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ ও জাতীয় সড়কের সমান্তরাল রাস্তা নিশ্চিত করা হবে।
কর্মকর্তারা বলেন, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এড়াতে সব ইউনিয়নের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে এবং কমপ্যাক্ট টাউনশিপ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হবে।
