সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে নয়: হাইকোর্ট
কোনো ব্যক্তির আগের বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে না— মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের এমন বিধান বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেছেন। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রেক্ষাপট
২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ৬ নম্বর ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন।
রুলে পারিবারিক জীবন রক্ষার বৃহৎ স্বার্থে বহুবিবাহ আইনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালা কেন করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে, স্ত্রীদের মধ্যে সমঅধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া আইন অনুসারে বহু বিবাহের অনুমতির বর্তমান প্রক্রিয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চেয়েছিলেন আদালত।
গত বছরের ২০ আগস্ট এই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে তা খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। এর ফলে ১৯৬১ সালের আইনের ওই বিধানটিই বহাল থাকল।
আইনে যা বলা হয়েছে
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারায় বহুবিবাহের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আইনের এই ধারার উপধারাগুলো নিম্নরূপ:
১) কোনো ব্যক্তির বিবাহ বলবৎ থাকাকালে তিনি সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না। এই অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিবাহ ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।
২) অনুমতির জন্য নির্ধারিত ফি-সহ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে। সেখানে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হবে।
৩) আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। এই প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সালিশি কাউন্সিল যদি প্রস্তাবিত বিবাহটি 'প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত' মনে করে, তবেই নির্দিষ্ট শর্তে অনুমতি দিতে পারবে।
৪) সালিশি কাউন্সিল তাদের সিদ্ধান্তের কারণ লিপিবদ্ধ করবে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনার (রিভিশন) আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সহকারী জজের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে এবং এর বৈধতা নিয়ে অন্য কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
৫) সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া কেউ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে:
(ক) তিনি বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। টাকা পরিশোধ না করলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হবে।
(খ) অপরাধী সাব্যস্ত হলে তিনি এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
রিটকারীর যুক্তি
রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এই বিধানের মাধ্যমে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তিনি বলেন, 'ইসলামী আইনে চারজন স্ত্রী রাখার কথা বলা হলেও সেখানে সবার প্রতি সমান সুবিচারের কঠোর নির্দেশ রয়েছে। আইনের এই বিধানের মাধ্যমে শুধু বিয়ের অংশটুকুই নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সুবিচার নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত রক্ষাকবচ রাখা হয়নি।'
অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদনকারীর আর্থিক সংগতি যাচাই করার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। মালয়েশিয়ায় এই প্রক্রিয়া আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এছাড়া বর্তমানে কোনো চেয়ারম্যান নিজে বিয়ে করতে চাইলে নিজেকেই নিজে অনুমতি দেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে বর্তমান আইনটি বহাল থাকলেও, আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন যে তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করবেন।
