ডাকসু থেকে জকসু: যে কারণে বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির একচেটিয়া জয় পেল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) থেকে শুরু করে সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন—সাম্প্রতিক পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই শীর্ষ তিন পদসহ অধিকাংশ পদে জয়লাভ করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রথম এই নির্বাচনে ২১টি পদের মধ্যে শিবির সমর্থিত প্যানেল 'অদম্য জবিয়ান ঐক্য' ১৬টি পদে জয়লাভ করেছে।
আবাসিক হলবিহীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের এই বিপুল জয়ের পেছনে তাদের দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশল, বিগত শাসনামলে পদ্ধতিগতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করা এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রমকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একমাত্র ছাত্রী হলে (নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল) উপঢৌকন পাঠানো, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করা ও আর্থিক সহযোগিতা তাদের নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে শিবিরের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল, দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং শিবিরের বিরোধী পক্ষগুলোর ভোট বিভক্ত হয়ে পড়াও তাদের একচেটিয়া জয়ের অন্যতম কারণ।
সম্প্রতি আবাসন সুবিধাবঞ্চিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন 'মেধাবী প্রকল্প'র আওতায় আবাসন সুবিধা প্রদান করেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এই প্রকল্পের পেছনে ছাত্রশিবিরের প্রভাব ও সমর্থন নির্বাচনে জয় পেতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। একটি দাতব্য সংস্থা হিসেবে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে এগিয়ে আসায় এবং আবাসন সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শিবিরের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করায় নির্বাচনী ফলাফল তাদের পক্ষে গেছে।
আস-সুন্নাহ প্রকল্পের আবাসনে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, 'ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলই আমার প্রথম পছন্দ। তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও পরোপকারী মনোভাব আমাকে মুগ্ধ করেছে। শিক্ষার্থীদের যেকোনো বিপদে তাদের সব সময় পাশে পাওয়া যায়।'
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আস সুন্নাহ প্রকল্পের ছাত্রদের সঙ্গে শিবির প্রার্থীদের নিয়মিত যোগাযোগ লক্ষ্য করা গেছে। তবে, ছাত্র শিবির আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনে কোনো প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রম বা প্রচারণার সুযোগ ছিল না।
অন্যদিকে শিবিরের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করতে পারেনি। নির্বাচনী প্রস্তুতিতেও তাদের ঘাটতি ছিল। তবে ছাত্রশিবির তাদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে শিক্ষার্থীদের ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল বলে দাবি ছাত্রদলসহ অন্যান্য প্যানেলের প্রার্থীদের।
জবিতে ছাত্রদল সমর্থিত 'ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান' প্যানেলের সদস্য পদপ্রার্থী ইমরান হোসেন ইমন বলেন, 'স্বৈরাচারী হাসিনার আমলে যখন আমাদের ক্যাম্পাসে ঢুকতেই দেওয়া হতো না, তখন ছাত্রলীগের পাশেই এখনকার শিবিরের অনেক কর্মীকে দেখা যেত। আমাদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয়ের সততা আর শিবিরের গোপন কৌশলই সম্ভবত আমাদের পরাজয়ের মূল কারণ।'
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের কর্মীদের প্রবেশ করতে না দিলেও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা পরিচয় গোপন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে থেকে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে পেরেছিল। একই চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ছাত্রলীগের নির্যাতনের কারণে তারা হলে থাকতে পারেননি। ৫ আগস্টের পর তারা হলে ফেরেন। অন্যদিকে, পরিচয় গোপন করে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা আগে থেকেই হলগুলোতে অবস্থান করছিলেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে 'ব্যাচ প্রতিনিধি' নির্বাচনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় শিবিরের নেতাকর্মীরা।
ডাকসু নির্বাচনের পর নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হলের ছাত্রদলের জিএস পদপ্রার্থী 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'কে বলেন, 'মনোনয়ন জমা দেওয়ার দুদিন আগেও আমাদের জানানো হয়নি আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি কি না। আমাদের একধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রাখা হয়েছিল। যদি আগে জানতাম, তবে সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতাম। সংগঠন থেকে সরাসরি না হলেও অন্তত ইঙ্গিত দিলেও আমরা কাজ করতে পারতাম।'
শিক্ষার্থীদের মতে, শিবির তাদের দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার অনেক আগেই মাঠ গোছাতে শুরু করেছিল, যা অন্য দলগুলো করতে পারেনি। প্রচারণার সময় শিবির তাদের দলীয় পরিচয়ের চেয়ে গত ১৫ বছরের 'নিপীড়িত ও মজলুম' পরিচয় এবং 'সৎ ইমেজ'কে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় প্রার্থীরাও সুবিধা করতে পারেননি। তাদের প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা সাড়া দিলেও ব্যালটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। জকসু নির্বাচনে 'মওলানা ভাসানী ব্রিগেড' প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী ইভান তাহসীব বলেন, 'শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিবিরের দীর্ঘদিনের সংযোগ ছিল। তাদের ভোটেই তারা নির্বাচিত হয়েছে। তাদের জন্য শুভকামনা। তবে জকসু যেন কোনো শিক্ষার্থী-বিরোধী অবস্থান না নেয়, তা তাদের নিশ্চিত করতে হবে।'
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে শিবিরের 'গুপ্ত' অবস্থান এবং ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক শিবিরের জয়ের বড় নিয়ামক। হাসিনা আমলের ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে বড় পরিবর্তন এনেছে।
বিশিষ্ট নাগরিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিদের সংগঠন 'গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি'র সদস্য বাকী বিল্লাহ 'বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'কে বলেন, 'শিবিরের সাফল্যের পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, ছাত্রলীগের ভেতরে থাকা পুরোনো "গুপ্ত নেটওয়ার্ক" ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শিবিরের জন্য একটি "রানিং ফোর্স" হিসেবে কাজ করেছে। অতীতে ক্ষমতার রাজনীতিতে অভিজ্ঞ অনেক চরিত্র এখন শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় ক্যাম্পাসের পাওয়ার ডাইনামিক ও শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝায় তারা এগিয়ে।'
তিনি আরও বলেন, 'দ্বিতীয় ও প্রধান কারণটি হলো শিক্ষার্থীদের ভয়—পুরোনো দখলদারিত্বের রাজনীতি ফিরে আসা। ডাকসুর আগে ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের মনে সেই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়। ফলে তুলনামূলক "নিরাপদ" মনে করে শিক্ষার্থীরা শিবিরকেই বেছে নিয়েছে।'
এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ, ভর্তি কোচিং এবং 'ওয়েলফেয়ার কার্যক্রম' পরিচালনা করাও শিবিরের জয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন 'স্বচিন্তন'-এর সদস্য শাহেদ হোসেন বলেন, 'জাকসুতে শিবিরের বড় কৌশল ছিল নিজেদের ভোটব্যাংককে চেনা এবং প্রতিপক্ষের ভোটব্যাংককে বিভক্ত করা। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য দলগুলোর প্রার্থীদের হেয় করা এবং নিজেদের প্রার্থীদের চিন্তা-বক্তব্যকে মহিমান্বিত করার প্রচারণাও তাদের পক্ষে কাজ করেছে।'
তবে ছাত্রশিবির তাদের জয়কে 'শিক্ষার্থীবান্ধব' কার্যক্রমের ফল হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীরা একটি নিরাপদ ও দখলদারিত্বমুক্ত ক্যাম্পাসের যে রূপরেখা চেয়েছিল, শিবির সেটিই তুলে ধরতে পেরেছে।
সদ্য নির্বাচিত জকসুর শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বলেন, 'শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে— এ বিশ্বাস তৈরি করেছে ছাত্র শিবির। অতীতের ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনও তাদের পক্ষে গেছে। পাশাপাশি চারটি ক্যাম্পাসের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব জকসু নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন ধারার রাজনীতিতে 'জেনারেশন জি' যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস চায়, শিবির তা দিতে পেরেছে বলেই শিক্ষার্থীরা মনে করছে।'
