ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভনে ফেলে বাংলাদেশিদের নেপালে নিয়ে নির্যাতনের পর আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধ মানব পাচারের নতুন ট্রানজিট রুট হিসেবে উঠে এসেছে নেপালের নাম। ইউরোপে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের নেপালে নেওয়া হয়—এমন বেশ কিছু ঘটনার খবর পাওয়া গেছে গত এক বছরে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন, জিম্মি করে আদায় করা হয় মুক্তিপণ।
গত ১ ডিসেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) নেপালে মানব পাচার-সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠায়। ওই প্রতিবেদনে নেপাল রুট ব্যবহার করে কীভাবে পাচার কার্যক্রম চলছে, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেশি-বিদেশি দালালদের সমন্বয়ে একটি সক্রিয় মানবপাচারকারী চক্র গড়ে উঠেছে, যারা নেপাল রুট ব্যবহার করছে। এই চক্রের মূল টার্গেট ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি বাংলাদেশি তরুণরা। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে তাদের অবৈধভাবে পাঠানোর হয়।
খুব অল্প কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিরা অন অ্যারাইভাল ভিসা পান। নেপাল সেই দেশগুলোর অন্যতম। পাচারকারীরা এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে নেপালকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে।
শুরুতে দালালরা ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের আকৃষ্ট করে। এরপর ভিজিট ভিসায় তাদের নেপালে যেতে বলা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর গন্তব্য দেশের ভুয়া ভিসা দেখিয়ে প্রতারণা করা হয় ভুক্তভোগীদের সাথে। একপর্যায়ে তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
এনএসআইয়ের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৪ নভেম্বর ইমিগ্রেশন পুলিশ পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে। তাদের কাছে নেপাল থেকে সংগ্রহ করা বেলজিয়ামের ভুয়া ভিসা ছিল। এর আগে ৩০ অক্টোবর কানাডায় উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিলেটের তিনজন বাংলাদেশিকে একটি দালাল চক্র নেপালে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রানজিট রুট হিসেবে নেপালকে ব্যবহার করে ঘটা এসব পাচারের ঘটনা বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পাচারের তিন রুট
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সক্রিয় দালাল চক্র আকাশ ও স্থল—উভয় পথ ব্যবহার করে নেপাল হয়ে ইউরোপে মানব পাচারের জন্য তিনটি রুট ব্যবহার করছে।
আকাশপথে দালালরা যেসব রুট ব্যবহার করে সেগুলো হলো: বাংলাদেশ (ঢাকা)–নেপাল (কাঠমান্ডু)–চীন (হংকং)–উত্তর আমেরিকা (কানাডা); বাংলাদেশ (ঢাকা)–নেপাল (কাঠমান্ডু)–ইতালি (রোম)–ইউরোপ (বেলজিয়াম) ও বাংলাদেশ (ঢাকা)–ভারত–নেপাল (কাঠমান্ডু)।
স্থলপথেও দালালরা ভুক্তভোগীদের নেপালে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত রুটগুলো হলো: ঢাকা/খুলনা–বেনাপোল/ভোমরা–ভারত (পেট্রাপোল/কলকাতা/শিলিগুড়ি) –কাঁকরভিটা–কাঠমান্ডু।
নেপাল কেন পাচারের নতুন রুট?
প্রতিবেদনে নেপালকে পাচারের নতুন রুট হিসেবে বেছে নেওয়ার বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা, জটিল ভিসা যাচাই-বাছাই ও কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি না থাকা, ভারতের মাধ্যমে সহজ স্থল ও আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাংলাদেশ ও নেপালের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে পর্যাপ্ত তথ্য আদান-প্রদান ও নজরদারির অভাব।
ভুক্তভোগী ও দালাল চক্র
প্রতিবেদনে নেপাল রুট ব্যবহার করে পাচারের শিকার বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর নাম চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের শাহরিয়ার রহমান, মোগলাবাজারের মো. হাফিজ উদ্দিন, দক্ষিণ সুরমার এমএ মান্না; শরীয়তপুরের জাজিরার মাহবুব হোসেন; কুমিল্লার লালমাইয়ের মনির হোসেন, শাহ পরান আল শামীম ও ওহিদুর রহমান; যশোরের শার্শার স্বজন মাহমুদ এবং শরীয়তপুরের জহিরুল ইসলাম।
এছাড়া প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন দালালের নামও উঠে এসেছে। তারা হলেন আশা ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলের সাজহারুল হক মুকুল; চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মো. আল আমিন ও হাজীগঞ্জের সুমন আহমেদ; কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মো. আলমগীর হোসেন; নোয়াখালীর মালয়েশিয়াপ্রবাসী এবিএম নজরুল; শরীয়তপুরের জাজিরার মো. আয়নাল ও নড়িয়ার মো. মিলন; ঢাকার মো. গিয়াস উদ্দিন এবং সিলেটের ব্রিটিশ নাগরিক মিজানুর আমিন, মো. শামীম ও মিরাবাজারের মো. শোয়েব।
কানাডায় নিরাপদে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেপালে নিয়ে যাওয়া সিলেটের তিন তরুণের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। নেপালে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তারপর কাঠমান্ডুর কালাঙ্কি-১৪ এলাকার হোটেল ডেল্টা ইন-এ আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
পাচারকারীরা প্রথমে তাদের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করে, পরে দাবি করা অর্থের পরিমাণ আরও ১২ লাখ টাকা বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে একজন দালাল গ্রেপ্তার হওয়ার পর নেপালের পাচারকারীরা ভুক্তভোগীদের নেপালের একটি অজানা বিমানবন্দরে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। শেষপর্যন্ত ব্র্যাক ও নেপাল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ওই ভুক্তভোগীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
ভুয়া বেলজিয়ান ভিসা
গত ৪ নভেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের কাছে বেলজিয়ামের ভুয়া ভিসা পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে, ইতালি হয়ে বেলজিয়ামে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তারা গত ১০ সেপ্টেম্বর নেপালে গিয়েছিলেন; সেখানে কাঠমান্ডুর বেলজিয়াম কনস্যুলেটের কাছাকাছি থেকেছেন। সেখানে একজন নেপালি দালাল তাদের হাতে জাল ভিসা তুলে দেয়। জানা গেছে, ওই ভিসাগুলো নেপালের থামেল এলাকার কোনো এক কম্পিউটারের দোকানে তৈরি করা হয়েছিল। আটকদের মধ্যে একজন নিজেও ভুক্তভোগী হলেও তদন্তে অন্য বিদেশগমনেচ্ছুদের পাসপোর্ট ও ভিসা-সংক্রান্ত লেনদেনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
আরেকটি ঘটনায় শরীয়তপুরের এক ব্যক্তিকে নেপাল হয়ে সার্বিয়ায় কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তিনি নেপালে পৌঁছানোর পর পাচারকারীরা তার পরিবারকে মিথ্যা তথ্য দেয় যে তিনি সার্বিয়ায় পৌঁছে গেছেন; এরপর ৩৫ লাখ টাকা দাবি করে। পরে নেপালের ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তায় ওই ভুক্তভোগী পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
প্রতিবেদনের সুপারিশ
প্রতিবেদনে নেপালকেন্দ্রিক মানব পাচারের মামলাগুলো তদন্তের জন্য সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন-এ হস্তান্তর করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিদেশি মিশনগুলোকে বিষয়টি অবহিত করা এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মাধ্যমে অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেনের তদন্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান টিবিএসকে জানান, নেপালে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশে একজন দালালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টির তদন্ত চলছে। এর সাথে বিদেশি দালালদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, নেপাল হয়ে ইউরোপে মানব পাচারের এই চেষ্টা প্রায় এক বছর ধরে চলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইউরোপে যাওয়ার জন্য নেপাল কোনো বৈধ ট্রানজিট দেশ নয়। সাধারণ মানুষকে এ ধরনের অফারের ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শরিফুল আরও বলেন, সহজে ভিসা পাওয়া এবং বিমানের ভাড়া তুলনামূলক কম হওয়ার কারণেই পাচারকারীরা নেপাল রুট ব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছে।
