অভিবাসন খাত নিয়ে শ্বেতপত্রের সতর্কবার্তা, তবু সংকুচিত হচ্ছে শ্রমবাজার, বাড়ছে রিক্রুটিং এজেন্সি
বিগত সরকারের আমলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাতের একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সরকারের এক শ্বেতপত্র। তা সত্ত্বেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ২৫০টিরও বেশি নতুন রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছে। এতে অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা বিষয়ক শ্বেতপত্রে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রিক্রুটিং এজেন্সির নজিরবিহীন বিস্তারকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই শ্বেতপত্রের তথ্যানুসারে, ২০১৫ সালে যেখানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির সংখ্যা ছিল ৯২৩টি, ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০-তে দাঁড়ায়। এই বৃদ্ধির মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল তদারকি ও দুর্নীতি।
তবে সেই প্রবণতা রোধ করার পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথে হাঁটছে। গত বছরের ৪ নভেম্বর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ২৫২টি নতুন রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দেয়। ফলে এখন মোট এজেন্সির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৬টি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাজারের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার যখন সংকুচিত হয়ে আসছে, তখন নতুন লাইসেন্স দেওয়া হলে এই খাতকে আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী শ্রম-রপ্তানিকারক দেশগুলোতে বাজারের আকার এবং প্রশাসনিক কাঠামোর তুলনায় রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা অনেক কম।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যমতে, নেপালে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সি প্রায় ৪১৬টি, শ্রীলঙ্কায় ২৪৮টি, মিয়ানমারে প্রায় ৬০০টি ও ভারতে নিবন্ধিত রিক্রুটার প্রায় ১৯২টি। অন্যদিকে পাকিস্তানের মধ্যপ্রাচ্য-কেন্দ্রিক বাজার বাংলাদেশের সমতুল্য হলেও দেশটিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা মাত্র ৪৬৪-এর কিছু বেশি। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ২ হাজার ৬৪৬টি এজেন্সি সংকুচিত শ্রমবাজারের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি।
শ্রম অভিবাসন ২০২৫ বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে রামরু উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালে ১৮৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও ১৯১টি এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু একই বছরে ২৫২টি নতুন এজেন্সির লাইসেন্সের আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। এটি রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমানোর ঘোষিত লক্ষ্যের পরিপন্থি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এজেন্সিগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা অবৈধ ভিসা ব্যবসার পথ প্রশস্ত করে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য-কেন্দ্রিক শ্রমবাজারে। এতে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যায়। সরকারিভাবে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশি কর্মীদের তার চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি অর্থ গুনতে হয়।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বিচক্ষণ বা দূরদর্শী বলা যায় না।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়ালেই অভিবাসন ব্যয় কমে না। বরং সরকারের উচিত ছিল দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করে তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা।'
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে বস্তুত ৫০০ থেকে ৮০০টির বেশি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রয়োজন নেই।
'অথচ আমরা পরস্পরবিরোধী নীতি দেখছি—একদিকে কিছু লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রায় ২০০ নতুন লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এই দ্বিমুখী অবস্থান পুরো শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অসম্ভব করে তুলেছে,' বলেন তিনি।
সংকুচিত শ্রমবাজার, বাড়ছে এজেন্সি
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকাংশেই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। চাকরির চাহিদাপত্র জোগাড় করতে অনেক এজেন্সি অবৈধ ভিসা বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। এটিই চড়া অভিবাসন ব্যয়ের প্রধান কারণ।
এজেন্সির সংখ্যা যত বাড়বে, প্রতিযোগিতাও তত তীব্র হবে। ফলে ভিসার দামও বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত বোঝা চাপে কর্মীদের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুন থাকায় অধিকাংশ এজেন্সি সেখানে কর্মী পাঠাতে আগ্রহ দেখায় না। ফলে শ্রমবাজার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের ওপর অতিনির্ভরশীল এবং অনিয়মের ঝুঁকিতে থেকে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১১.২৫ লাখ কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯ লাখেরও বেশি গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে সৌদি আরবে। ওমান, মালয়েশিয়া ও বাহরাইনের মতো বড় বাজারগুলো বর্তমানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ রয়েছে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার টিবিএসকে বলেন, 'শ্রমবাজার যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজনের সম্পূর্ণ বিপরীত পদক্ষেপ।
'আমাদের এখন প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি এবং র্যাঙ্কিং-ভিত্তিক ব্যবস্থা। নইলে অভিবাসন খাত আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে।'
নতুন লাইসেন্সধারীদের নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অভ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, নতুন লাইসেন্স পাওয়া এজেন্সির মালিকদের একটি বড় অংশ আগে প্রবাসী কর্মী হিসেবে কাজ করতেন এবং রিক্রুটিং ব্যবসায় আসার আগে ভিসা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বায়রার এক সূত্র বলেন, 'এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।'
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির এই আকস্মিক বৃদ্ধি শাসনব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, 'মুক্ত শ্রমবাজারে কাউকে ব্যবসা করা থেকে জোর করে বিরত রাখা যায় না। তবে কর্মী সুরক্ষা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলো তুলনামূলক ছোট এবং সীমিত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাজ করে। এত বিপুলসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির কোনো যৌক্তিকতা নেই।'
জালাল উদ্দিন লাইসেন্সিং ব্যবস্থার ব্যাপক অপব্যবহারের অভিযোগও তোলেন।
'অনেক সময় একজন ব্যক্তিই নিজের নামে, আত্মীয়-স্বজনের নামে কিংবা সহযোগীদের নামে একাধিক লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ করেন। এর ফলে একটি লাইসেন্স বাতিল হলেও অন্যটির মাধ্যমে অনায়াসে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া যায়। কাগজে-কলমে এজেন্সির সংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত মালিকের সংখ্যা আসলে অনেক কম,' বলেন তিনি।
রামরু তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করেছে। তারা পরামর্শ দিয়েছে, যদি কোনো একটি পরিবারের হাতে একাধিক লাইসেন্স থাকে তবে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
জালাল উদ্দিন শিকদার জোর দিয়ে বলেন, কঠোর ও স্বচ্ছ র্যাংকিং ব্যবস্থা থাকলে অসাধু এবং অদক্ষ এজেন্সিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজার থেকে ছিটকে পড়বে।
'ভারতের মতো বড় শ্রমবাজারেও রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা সীমিত। কারণ সেখানে কেবল মানসম্মত সেবা প্রদানকারীরাই টিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন,' বলেন তিনি।
হাসিনা সরকার ও এজেন্সির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার
২০১৯ সালের রিক্রুটিং এজেন্সি বিধিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও স্থগিত করার দায়িত্ব বিএমইটির। ১৯৭৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সরকার মোট ৯৩৫টি এজেন্সিকে লাইসেন্স দিয়েছিল; অর্থাৎ বছরে গড়ে ২০ থেকে ৩০টি নতুন লাইসেন্স দেওয়া হতো এবং অনিয়ম করলে লাইসেন্স বাতিলও করা হতো।
তবে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রেকর্ড ১ হাজার ১৮৫টি নতুন লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ২০২২ ও ২০২৩ সালেই দেওয়া হয়েছে ৮০০টি লাইসেন্স।
শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্টরা তাদের সংসদীয় পদ ব্যবহার করে নিজেদের অনুকূলে নীতি প্রণয়ন করায় এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ায় এই খাতের স্বচ্ছতা লোপ পেয়েছে।
বিএমইটি ও মন্ত্রণালয় যা বলছে
বিএমইটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় পর্যায়ে নেওয়া হয়।
'আমরা শুধু যোগ্যতার সত্যতা যাচাই করে আবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিই। চূড়ান্ত অনুমোদনের তালিকা সেখান থেকেই আসে,' বলেন তিনি।
বিএমইটি সূত্র জানায়, প্রায় তিন বছর ধরে ৪০০-র বেশি আবেদন ঝুলে ছিল, যার মধ্যে ২৫২টি অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি অনুমোদিত এজেন্সিকে জামানত হিসেবে ৩৫ লাখ টাকা এবং আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা ফি জমা দিতে হয়।
কর্মসংস্থান বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, 'আবেদনকারীরা বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার পর যদি অনুমোদন না পেত, তবে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ত।' তিনি আরও বলেন, মন্ত্রণালয় যদি সত্যিই এজেন্সির সংখ্যা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে চায়, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন আবেদন গ্রহণ স্থগিত করতে হবে।
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান সরকারের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, নতুন অনুমোদনের বেশিরভাগই বিগত সরকারের আমলে জমা দেওয়া আবেদন।
তিনি বলেন, 'এজেন্সিগুলো যদি নতুন বাজার খুঁজে বের করতে পারে, তবে নতুন লাইসেন্স দেওয়ায় আমি কোনো সমস্যা দেখি না। সরকারের উচিত নীতি ও ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া। বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাজার বোয়েসেল বা গুটিকয়েক বেসরকারি এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে। এই বিষয়গুলোর দিকে জরুরি নজর দেওয়া প্রয়োজন।'
প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, খাতটিকে 'আরও প্রতিযোগিতামূলক ও দক্ষ' করে তুলতেই এই লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়েছে।
