১ কোটি কর্মসংস্থান, নানা বাধা: নতুন সরকার কি অভিবাসন খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে?
২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা সরকারের সামনে এখন প্রধান বাধা হলো বন্ধ শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালু করা এবং রিক্রুটমেন্ট সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
আনুষ্ঠানিকভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও অভিবাসন খাত এখনো চড়া অভিবাসন ব্যয় ও দক্ষতার ঘাটতিতে স্থবির হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এ পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব নয়। বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সরকারের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত কর্মী পাঠানো ও কিছু কর্মীর অশোভন আচরণের অভিযোগে হাসিনা সরকারের শেষ সময় থেকেই মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো বেশ কয়েকটি প্রধান গন্তব্য বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে এসব বাজার পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের মে মাসে বন্ধ হওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেটের ফের সক্রিয় হওয়া নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
এছাড়া গন্তব্য দেশগুলোর কিছু 'অন্যায্য শর্ত' আরোপের কারণে আলোচনাকে জটিল হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগকারীরা বলছে, বিএনপি সরকার যদি এক কোটি মানুষের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চায়, তাহলে প্রধান শ্রমবাজারগুলো ফের চালু করা এবং বিশেষ করে দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন বাজার খোঁজা অপরিহার্য।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খোলার জন্য কর্মকর্তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে এক পরিচিতি সভায় তিনি এই নির্দেশনা দেন।
অভিবাসন খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করে মন্ত্রী বলেন, বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীরা যাতে প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্য বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হবে।
প্রখ্যাত অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনিম সিদ্দিকী আমলাতন্ত্র, নীতিনির্ধারক ও কিছু বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি অংশের মধ্যে অশুভ আঁতাত বন্ধের ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের আঁতাত বিদেশের শ্রমবাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
'আমরা যদি সত্যিই এই খাতকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিতে চাই, তবে এ ধরনের অশুভ জোট যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে,' বলেন তিনি।
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বনাম কাঠামোগত বাস্তবতা
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৫ লাখেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এই সময়ে গড়ে প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি কর্মী দেশ ছেড়েছেন, যাদের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন অদক্ষ বা স্বল্প-দক্ষ শ্রেণির।
পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ লোক পাঠাতে হবে—যা সাম্প্রতিক সময়ের বার্ষিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য নিবিড় প্রস্তুতি প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, তবে প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করতে হবে।' তবে কেবল সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই সাফল্য নিশ্চিত হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাসনিম সিদ্দিকী শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, কারিগরি দক্ষতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সৌদি আরবের মতো গতানুগতিক বাজারের বাইরে গিয়ে শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দেন।
'শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বিনিয়োগ না করলে বাজার তার নিজের নিয়মেই চলবে এবং টেকসই ফলাফল অধরাই থেকে যাবে,' বলেন তিনি।
বিএনপির পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, দালালদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সহজ শর্তে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান ও নিম্ন-আয়ের কর্মীদের জন্য 'শূন্য বা ন্যূনতম ব্যয়ে' অভিবাসন নিশ্চিত করা।
দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সংস্কার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষ কর্মী পাঠানোর হার বাড়াতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি।
কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (টিটিসি) আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, অনেক পদ এখনো শূন্য; প্রশিক্ষকদের নিজেদেরও পেশাদার উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। মানসম্মত দক্ষতা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সম্পদ, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, আধুনিক সরঞ্জাম ও 'প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ' দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বিএমইটি সৌদি আরবের শ্রমবাজারের জন্য ২৬টি টিটিসিতে দক্ষতা যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, বর্তমানে দেশজুড়ে ১১০টি কেন্দ্র পরিচালনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টা এখনো প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার মনে করেন, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।
তিনি বলেন, 'ডিগ্রিনির্ভর মানসিকতা থেকে রাতারাতি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় আসা সম্ভব নয়। এটি একটি বড় সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ।' অনেক তরুণ কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার চেয়ে প্রথাগত অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রিকে এখনো বেশি প্রাধান্য দেয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে গেছে, যা বিয়ের সম্বন্ধ থেকে শুরু করে সামাজিক স্বীকৃতি—সবক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। ফলে বিদেশের বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেকে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে দ্বিধাবোধ করেন।
বর্তমান কারিগরি শিক্ষা অবকাঠামো পর্যাপ্ত কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
জালাল উদ্দিন বলেন, 'কেবল ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। আমাদের আধুনিক সরঞ্জাম, যুগোপযোগী সিলেবাস ও দক্ষ প্রশিক্ষক প্রয়োজন।' এক্ষেত্রে তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি নার্সিং খাতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিশ্ববাজারে এই খাতের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও দেশে এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা
অভিবাসন খাতের উচ্চ ব্যয় দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য একজন অদক্ষ কর্মীকে ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।
২০০৮ সালের আগে এই ব্যয়ের পরিমাণ সাধারণত ৮০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে ছিল।
২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতির শ্বেতপত্রে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এই বাড়তি খরচের জন্য অবৈধ ভিসা বাণিজ্য, দালালদের দৌরাত্ম্য ও চড়া বিমান ভাড়াকে দায়ী করছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অভ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, গন্তব্য দেশগুলো থেকে কাজের চাহিদা সংগ্রহ করতেই অভিবাসন ব্যয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, 'এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ বা সংস্কারের জন্য সরকারকে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।'
তাসনিম সিদ্দিকী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারগুণ পর্যন্ত বেশি। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমানে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলোকে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত অভিবাসন ব্যয় ফেরত দিতে হয়। তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, আর্থিক ক্ষতি, সময়ের অপচয় ও ভোগান্তির কথা বিবেচনায় রেখে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অভিবাসন ব্যয়ের অন্তত পাঁচ গুণ হওয়া উচিত।
'যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না থাকলে এমন প্রতারণা চলতেই থাকবে,' বলেন তিনি।
জালাল উদ্দিন সিকদার বলেন, দক্ষ কর্মীর সরবরাহ বাড়ানো এবং দেশে সমান্তরাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আসবে। এছাড়া তিনি দালাল চক্র নির্মূল করা, প্রক্রিয়া সহজ করা ও সঠিক তথ্যের প্রাপ্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যবস্থাকে একটি 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' মডেলে রূপান্তরের প্রস্তাব দেন, যেখানে পাসপোর্ট তৈরি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ছাড়পত্র দেওয়ার মতো কাজগুলো এক ছাদের নিচেই সম্পন্ন হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে দেওয়া হলে গ্রামীণ অভিবাসীদের ভোগান্তি ও খরচ কমবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরও বলেছেন, অভিবাসন ব্যয় কমানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি বলেন, 'যেকোনো মূল্যে অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে।' তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে অনেক কর্মীকে পৈত্রিক জমি বা গয়না পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়।
