গণভোট: অন্তর্বর্তী সরকার কি ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য প্রচারণা চালাতে পারে?
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য জুলাই সনদের গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের জন্য প্রচারণা শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তরের মাধ্যমে এ প্রচারণা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রচারণায় যুক্ত করা হচ্ছে পোশাক কারখানা, ব্যাংক, এনজিওসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও।
জাতীয় গণভোটে একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের এমন প্রচার চালানোর আইনগত বৈধতা আছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ এই প্রচারণার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধানতম এজেন্ডা হচ্ছে সংস্কার, বিচার দৃশ্যমান করা ও নির্বাচন। সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে জুলাই সনদকে গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত করতে হবে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারণা চালানোর কোনো সুযোগ নেই। এরকম কর্মকাণ্ড নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপের শামিল এবং এটি ভবিষ্যতে দেশকে রাজনৈতিকভাবে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ৫ জানুয়ারি তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএকে চিঠি দিয়ে গণভোট বিষয়ে ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রত্যেক পোশাক কারখানার সামনে গণভোট-বিষয়ক প্রচারণা লিখে দুটি ব্যানার প্রদর্শন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সব এনজিওর মাধ্যমে গণভোটের প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো আজ (৮ জানুয়ারি) একটি সভা ডেকেছে। এনজিওগুলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রচারণা চালাবেন। যেসব জায়গায় সরকারি প্রচারণা পৌঁছানো যাচ্ছে না, সেখানে এনজিওগুলোর মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হবে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের চিঠিতে ব্যানারে সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোটের বিষয়বস্তু তুলে ধরতে বলা হয়েছে। যেখানে লেখা রয়েছে 'হ্যাঁ' ভোট দিলে সংস্কার প্রস্তাবের সবকিছু পাবেন। আর 'না' ভোট দিলে কিছুই পাবেন না। পরিবর্তনের জন্য 'হ্যাঁ'।
একইভাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও প্রতিটি সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরের মাধ্যমে সর্বাত্মকভাবে গণভোটের প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। টিবিএসের হাতে আসা সভার কার্যবিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৬ জানুয়ারি আলী রীয়াজ টিবিএসকে বলেন, 'এই সরকার অন্যান্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নয়; একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধানতম এজেন্ডা হচ্ছে সংস্কার, বিচার দৃশ্যমান করা ও নির্বাচন। এখন সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে জুলাই সনদকে গণভোটে "হ্যাঁ" জয়যুক্ত করতে হবে।
'সনদ ও সংস্কারের জন্যই তো ঐকমত্য কমিশনসহ অন্যান্য কমিশন গঠন করা হয়েছিলো। আমরা সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছি; "হ্যাঁ" ভোটের পক্ষে সরকারি প্রচারণা চালাতে আইনি কোনো বিধিনিষেধ কিংবা অসুবিধা নেই। আইনসম্মতভাবেই গণভোট-কেন্দ্রিক আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এতদিন আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করেছি। এখন আমরা গণভোটে "হ্যাঁ"-এর পক্ষে সর্বাত্মক প্রচারণা চালাব।'
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক অনলাইন সভায় আলী রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশ যাতে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় আর কখনও ফিরে না যায়, সেজন্যই এবারের গণভোট।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে স্কুল—পুরোদমে চলবে প্রচারণা
৪ জানুয়ারির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, নির্বাচনের প্রচারণা যতদিন চালানো যাবে, তততিন পর্যন্ত গণভোটের প্রচারও চলবে। উপজেলা, জেলা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পর্যায়ে এই প্রচারণা চালানো হবে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সরকারি দপ্তরের প্রধানদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে গণভোটের প্রচারণা চালাতে হবে। ওইসব দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সব কর্মকর্তার ফেসবুকে সেটি ট্যাগ করতে হবে। এই প্রচারণা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে।
সব পর্যটনস্থল, পর্যটনস্থলের হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাসস্ট্যান্ড, ফেরি বা লঞ্চ ঘাট, ট্রেন স্টেশন, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন জনবহুল স্থানে ব্যানার বা পোস্টার লাগানো হবে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, ফেরিতে লিফলেট প্রদর্শন করা হবে।
এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণভোট-বিষয়ক ব্যানার স্থাপন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচারণা চালানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে আলাদা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে।
এছাড়া সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা এলাকার জনবহলস্থানে ডিজিটাল বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন বসানো হবে। চালানো হবে মাইকিং। গ্রাম পুলিশদের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কাজের ব্যয়ের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদকে নিজস্ব বাজেট থেকে ব্যয় করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই দায়িত্ব পড়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর।
ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় স্থানে প্রচারণা চালানোর দায়িত্ব নিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ গণভোট-বিষয়ক একটি ওয়েবসাইট তৈরি করবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল প্রচারের জন্য একটি টিম তৈরি করবে। স্থানীয় পর্যায়ের অপতথ্য প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাজ করবে এই বিভাগ।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই প্রচার কার্যক্রমের সুবিধার্থে ৩০টি ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করবে। এখন পর্যন্ত ৭টি কন্টেন্ট তৈরি হয়েছে। ভিডিও কন্টেন্টগুলো ভোটের গাড়িতে সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রচার করা হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সব সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যানার প্রদর্শন নিশ্চিত করতে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের গণভোট বিষয়ে সচেতন করবে।
জুলাই সনদ: স্বাক্ষর ও ভিন্নমত
জুলাই জাতীয় সনদ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি দলের ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন না করা, সংবিধানে গণভোটের বিধান চালু করা, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি ষ্পিকার নিয়োগ, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্য সৃষ্টি, অপরাধীদের রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না—এরকম ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওইসব প্রস্তাবসহ জুলাই সনদে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৬টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। যদিও বিএনপি ৯টি প্রস্তাবে 'নোট অভ ডিসেন্ট' বা ভিন্নমত দিয়েছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি রাজনৈতিক দল এতে সই করেনি।
গত ২৮ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায়-সম্পর্কিত সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করার সুপারিশ করে কমিশন। জাতীয় নির্বাচনের দিন বা তার আগে গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে বলে কমিশন মতামত দেয়।
এরপর ২৯ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ জমা দিয়েছে, তাতে অনেকগুলো অসংগতি রয়েছে বলে সমালোচনা করে বিএনপি। দলটির নেতারা ওই সময়ে বলেন, ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত হয়নি বা ঐকমত্য হয়নি, এমন বিষয়ও এতে সংযুক্ত করা হয়েছে। সুপারিশমালার সঙ্গে দেওয়া সংযুক্তিতে নোট অভ ডিসেন্টের কোনো উল্লেখ নেই।
রাজনৈতিক দলগুলো গণভোট আয়োজনের তারিখ নিয়ে একমত না হওয়ায় সরকার জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
উল্লেখ্য, বিএনপি শুধু জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন দুটিকে কেন্দ্র করেই প্রচারণা চালাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোটে প্রভাব ফেলা উচিত নয়: বিশেষজ্ঞবৃন্দ
তবে দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা বলছেন, সরকার গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর জয়ের জন্য প্রচারণা চালাতে পারে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, 'নির্বাচন আয়োজনকারী অন্তর্বর্তী বা তত্ত্ববধায়ক সরকার এভাবে কোনো ভোট বা গণভোটের পক্ষে "হ্যাঁ" ভোট চাইতে পারে, এটি আগে কখনো দেখিনি। কোনো আইন বা নৈতিকতার মানদণ্ডেও এভাবে ভোট চাওয়া যায় বলে আমার জানা নেই। এটি সরাসরি আইনবহির্ভূত বা নীতিবহির্ভূত বলাই যায়।'
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'যেকোনো ভোটে নাগরিক তার সাংবিধানিক স্বাধীনতার অধিকার অনুসারে যেকানো পক্ষে ভোট দেবে। এটাই ইউনিভার্সাল নিয়ম। এভাবে সরকারের কোনো পক্ষের কাছে ভোট চাওয়া বা ভোটের পক্ষে কাজ করার বিষয়টি একেবারেই আইন-বহির্ভূত।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক বিষয়, আর অন্তর্বর্তী সরকারের 'স্পিরিট' হচ্ছে অরাজনৈতিক।
আরেকজন আইনজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, নাগরিক মতামতের যথাযথ প্রতিফলনের ক্ষেত্রে সরকারকে নিরপেক্ষ থাকতে হয়।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সরকার চাইলে গণভোট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার প্রচারণা চালাতে পারে। সরকার গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরছে, গুরুত্ব তুলে ধরা দরকার। 'হ্যাঁ' বা 'না' বলছে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত 'গণভোট ২০২৬: কী ও কেন?' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট নিয়ে জনগণকে বোঝানোর কাজটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকার করতে গেলে অনেক কথা উঠবে। নির্বাচন কমিশনকেও গণভোট নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সেক্ষেত্রে যা সহযোগিতা দরকার, তা সরকার করবে।
৬ জানুয়ারি এক সভায় এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক দাউদ মিয়া বলেন, 'আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে একজন নাগরিক "হ্যাঁ" ভোট দিলে কী হবে এবং "না" ভোট দিলে কী হবে, এটি এনজিওগুলোর মাধ্যমে প্রচার করা হবে। এ নিয়ে ৮ জানুয়ারি একটি মিটিং রয়েছে।'
